শুধু জয় নয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে উড়িয়ে দেওয়ার আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামার কথা জানিয়েছিল বাংলাদেশ। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের দৌড়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ঘরের মাঠে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে সিরিজটি ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিপক্ষকে চাপে রেখে একের পর এক জয় তুলে নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল দলের। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সেই পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখা গেল না। বরং নিজেদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, পরিকল্পনার ঘাটতি আর ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল দিয়ে বড়সড় ধাক্কা খেল বাংলাদেশ।
ব্যাটিং কিংবা বোলিং—কোনো বিভাগেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে পেরে ওঠেনি স্বাগতিকরা। ব্যাট হাতে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে পারেনি বাংলাদেশের ব্যাটাররা। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে দলকে বারবার বিপদে ফেলেছেন তারা। অন্যদিকে বোলিংয়েও প্রতিপক্ষের ওপর প্রত্যাশিত চাপ তৈরি করতে পারেনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটাররা অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যেই বাংলাদেশের বোলিং সামলে নিজেদের কাজটা করে গেছেন।
তবে এই পরাজয়কে কেবল ব্যাটিং কিংবা বোলিং ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পুরো ম্যাচজুড়েই বাংলাদেশের শরীরী ভাষায় ছিল না প্রত্যাশিত আত্মবিশ্বাস ও লড়াকু মানসিকতা। মাঠের ক্রিকেটে যেমন পরিকল্পনার অভাব চোখে পড়েছে, তেমনি মাঠের বাইরের নানা কর্মকাণ্ডও দলকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। সব মিলিয়ে একটি দল হিসেবে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি বাংলাদেশ।
অথচ ঘরের মাঠে খেলার সুবিধা, পরিচিত কন্ডিশন এবং সমর্থকদের প্রত্যাশা—সবকিছুই ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার কথা ছিল স্বাগতিকদের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে ওয়েস্ট ইন্ডিজই নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। ক্যারিবীয়দের আগ্রাসন ও শৃঙ্খলাপূর্ণ ক্রিকেটের সামনে বারবার অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে বাংলাদেশ।
শেষ পর্যন্ত ৮ উইকেটের বিশাল পরাজয় শুধু একটি ম্যাচ হারার গল্প হয়ে থাকল না। বরং বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস, প্রস্তুতি এবং দলীয় পরিকল্পনা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিল। যে দল সিরিজ শুরুর আগে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, সেই দলকেই এখন নিজেদের ভুলগুলো খুঁজে বের করতে হবে।
চতুর্থ দিনের সকালে ব্যাটিংয়ে নেমে খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে শেষদিকে নাঈম হাসানের লড়াইয়ে কিছুটা সম্মানজনক সংগ্রহ পেয়েছে স্বাগতিকরা। আগের দিনের ৭৯ রানের সঙ্গে ৬৩ রান যোগ করে বাংলাদেশ অলআউট হয় ১৪২ রানে।
দিনের শুরুতেই সাজঘরে ফেরেন জাকের আলী। জোমেল ওয়ারিক্যানের বলে রোস্টন চেজের হাতে ক্যাচ দেওয়ার আগে ২২ রান করেন তিনি। এরপর একপ্রান্ত আগলে রেখে লড়াই চালিয়ে যান নাঈম। আট নম্বরে ব্যাট করতে নেমে টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতকের দেখা পান এই ব্যাটার। বৃষ্টির বিরতির আগে ও পরে ওয়ারিক্যানের বলে একটি করে চার মেরে এবং দ্রুত এক রান নিয়ে মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।
নাঈমকে দুবার জীবন দেন চেজ। ওয়ারিক্যানের বলে পরপর দুই ওভারে ক্যাচ ফেলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক। এর আগে ওয়ারিক্যানও নিজের বলে নাঈমের একটি সহজ ক্যাচ নিতে পারেননি। তবে শেষ পর্যন্ত নাঈমকে থামান চেজই। মিসহিটে মিড-অনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ৫০ রান করা এই ব্যাটার।
বাংলাদেশের শেষ দিকের ব্যাটারদের মধ্যে হাসান মাহমুদ করেন ৮ রান। ৩১ বলের ধৈর্যশীল ইনিংসটি শেষ হয় ওয়ারিক্যানের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে। তাইজুল ইসলাম রিভার্স সুইপে চার মারলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। চেজের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে বল হাতে দুর্দান্ত ছিলেন অধিনায়ক চেজ। ৩৬ রানে ৫ উইকেট নিয়ে টেস্টে ১০০ উইকেটের মাইলফলকও পেরিয়েছেন তিনি। ওয়ারিক্যান নিয়েছেন ৬৩ রানে ৪ উইকেট।
১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ওপেনার ব্রেন্ডন কিং ও জন ক্যাম্পবেল ১১২ রানের জুটি গড়েন। তিন স্পিনার মিরাজ, তাইজুল ও নাঈম বোলিংয়ে এসে কিছু করতে পারেননি। জুটি ভাঙার চেষ্টায় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে রিভিউ নিয়েছেন তিনবার। কিন্তু প্রতিবারই টিকে গেছে আম্পায়ার্স কল।
স্পিনারদের আক্রমণের পর পেসার শরিফুলকে বোলিংয়ে আনেন শান্ত। তাতে মিলে সাফল্য। ৪৯ রান করা ক্যাম্পবেলকে বোল্ড করেন বাঁহাতি পেসার। এরপর আরেক পেসার হাসান মাহমুদ শর্ট বলে সীমানায় তালুবন্দি করান তেগনারিন চন্দ্ররপলকে। ৮ রানে ২ উইকেট তুলে বাংলাদেশ কিছুটা আশা জাগায়।
কিন্তু ব্রেন্ডন কিং ও কাভিম হজের অসাধারণ জুটিতে সব ওলটপালট। যে আয়নায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে রাখতে চেয়েছিল স্বাগতিকরা, সেখানে এখন তারা দাঁড়িয়ে নিজেরাই। কিং ৮১ ও হজ ৩১ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন। আগামী ৫ নভেম্বর সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হবে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!