উৎসবের রঙে সাজছে...
জাতীয়

কালেমাখচিত পতাকা মিছিলের নেপথ্যে ফুটবল বিশ্বকাপ ও ইসলামি প্রতিক্রিয়া

কালেমাখচিত পতাকা মিছিলের নেপথ্যে ফুটবল বিশ্বকাপ ও ইসলামি প্রতিক্রিয়া
লেখা বড়/ছোট করুন:

দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে কালেমাখচিত সাদা-কালো পতাকা নিয়ে মিছিল, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা ও বিভিন্ন স্থাপনায় পতাকা টাঙানোর ঘটনা বেড়েছে।

মাদারীপুর শহরের মডেল মসজিদ মোড়ে সম্প্রতি আসরের নামাজের পর প্রায় দেড় শতাধিক মুসল্লি জড়ো হন। তাদের অনেকের হাতেই ছিল কালেমাখচিত সাদা ও কালো রঙের পতাকা। কিছুক্ষণ পর মডেল মসজিদের সামনে থেকে মোটরসাইকেল র‍্যালি বের হয়। প্রতিটি মোটরসাইকেলে দুই বা তিনজন করে আরোহী ছিলেন। কয়েকজনের হাতে ছিল হ্যান্ডমাইক। স্লোগান দিতে দিতে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে মিছিলটি। পরে আবার মডেল মসজিদের সামনে ফিরে এসে সংক্ষিপ্ত সমাপনী অনুষ্ঠান করা হয়। মোটরসাইকেল র‍্যালি প্রায় এক ঘণ্টা চললেও সমাপনী অনুষ্ঠান ছিল দেড় মিনিটের মতো। তড়িঘড়ি করেই অনুষ্ঠান শেষ করে চলে যান অংশগ্রহণকারীরা।

সমাপনী বক্তব্যে ফখরুদ্দিন রাজী নামে একজন বলেন, তারা যে পতাকা নিয়ে মিছিল করেছেন, সেটিই ‘মুসলিমদের পতাকা’। মিছিলে অংশ নিয়ে নিজেকে স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম হিসেবে পরিচয় দেয়া তরিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি সাংবাদিকদের বলেন, দেশে যেহেতু ফুটবলকে ঘিরে বিভিন্ন দেশের পতাকা টাঙানো হচ্ছে এবং মিছিল হচ্ছে, তাই মুসলমানদের ‘ইসলামের নিশানা’ কোনটি, তা বোঝাতেই তারা এই র‍্যালির আয়োজন করেছেন।

শুধু মাদারীপুরেই নয়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে কালেমাখচিত পতাকা নিয়ে মিছিল ও সমাবেশ দেখা গেছে। অনেক জায়গায় অংশগ্রহণকারীরা এটিকে ইসলামের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ বলে দাবি করলেও পতাকার রঙ ও নকশা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। কারণ এসব পতাকার সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কিছু জঙ্গি বা উগ্রবাদী সংগঠনের ব্যবহৃত পতাকার মিল রয়েছে।

এদিকে এসব পতাকা টানানোর সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করায় ঢাকার একটি গণমাধ্যমকে হুমকি দেয়ার অভিযোগও উঠেছে।

ইসলামের কোনও নির্দিষ্ট পতাকা আছে কিনা—এ প্রশ্নও উঠেছে। গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে কালেমাখচিত পতাকা টানানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আলোচনায় আসে। ১৬ জুন মধ্যরাতে একদল যুবক ফ্লাইওভারের বিভিন্ন স্থানে এসব পতাকা টাঙান। পরদিন সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর পতাকা সরিয়ে ফেলার ঘটনাকে ‘ইসলামের পতাকার অবমাননা’ বলে উল্লেখ করে আবারও সেখানে পতাকা টাঙানো হয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ইসলামের পতাকার মর্যাদা রক্ষার’ দাবিতে মিছিলও হয়। যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় স্থানীয় কিছু তরুণ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নাম সামনে আসে।

এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও ইসলামী গবেষক মো. আনিসুজ্জামান সিকদার বলেন, ইসলামে নির্দিষ্ট কোনও পতাকার কথা উল্লেখ নেই। তিনি বলেন, ‘ইসলামের নামে যদি কোনো নির্দিষ্ট পতাকা থাকত, তাহলে সবাই সেটিই ব্যবহার করত। কোনও আলেম কখনও বলেননি যে, এটি বা ওটি ইসলামের পতাকা। রাসুল (সা.) যুদ্ধের সময় পতাকা ব্যবহার করেছেন, তবে বিভিন্ন যুদ্ধে বিভিন্ন রঙের পতাকা ছিল। ইসলামী ঐতিহ্যে নির্দিষ্ট কোনও পতাকার উল্লেখ পাওয়া যায় না।’

এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমটি হলো ফুটবল বিশ্বকাপ। এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে সারাদেশে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা টাঙিয়েছেন ফুটবলপ্রেমীরা। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা প্রায় সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, বিদেশি পতাকা টাঙানোর বিরুদ্ধে ইসলামপন্থিদের একটি অংশের অবস্থান।

এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামভিত্তিক একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি হারুন ইজহারের একটি বক্তব্য। সেখানে ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিদেশি পতাকার পাশাপাশি কালেমাখচিত পতাকা টাঙানোর আহ্বান জানাতে দেখা যায় তাকে।

যোগাযোগ করা হলে হারুন ইজহার বলেন, বক্তব্যটি তারই। ভিডিওটি গত ১৩ জুন ‘আল কুরআনের দারস’ নামে একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগিয়ে দিন। যদি এটাকে জঙ্গিবাদ বলা হয়, তাহলে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকাও নামাতে হবে। যেখানে ওগুলোর পতাকা থাকবে, সেখানে আমাদের কালেমার পতাকাও থাকবে।’

এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পরের দিনগুলোতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সাদা-কালো কালেমাখচিত পতাকা ওড়ানো, মিছিল, শোভাযাত্রা এবং ফ্লাইওভার, সেতু ও কালভার্টে পতাকা টাঙানোর ঘটনা বাড়তে থাকে। তবে এসব কর্মসূচির আয়োজন কারা করছেন বা পতাকা কারা টাঙাচ্ছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।

বাংলাদেশের গুম কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন বলেন, বর্তমানে যে ধরনের পতাকা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ব্যবহৃত পতাকার মিল রয়েছে। তার ভাষায়, ‘আল-কায়েদার প্রশিক্ষণ শিবির, নাইজেরিয়ার বোকো হারাম, আইএস—সব জায়গাতেই এই ধরনের পতাকা দেখা যায়। বাংলাদেশে অতীতে হরকাতুল জিহাদসহ বিভিন্ন সংগঠনও এই পতাকা ব্যবহার করেছে। এখন এটি ব্যবহার করছে হিযবুত তাহরীর।’

তার মতে, একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এসব পতাকা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘পতাকায় কালেমা লেখা থাকায় একজন মুসলমান স্বাভাবিকভাবেই এটিকে সম্মান করবেন। কিন্তু বিশ্বজুড়ে এই পতাকার যে প্রতীকী অর্থ তৈরি হয়েছে, সেটি সাধারণ মানুষের অনেকেরই জানা নেই।’

বাংলাদেশে এর আগেও নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের মিছিলে সাদা ও কালো কালেমাখচিত পতাকা দেখা গেছে। তাই নির্দিষ্ট এই নকশার পতাকা নিয়ে সন্দেহ ও উদ্বেগ নতুন নয়।

সাম্প্রতিক মিছিল ও পতাকা ওড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে মুফতি হারুন ইজহার বলেন, এসব আয়োজনের সঙ্গে তার কোনও সম্পৃক্ততা নেই। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের লালখান বাজারে আমাদের মাদ্রাসা ও লোকজন রয়েছে। কিন্তু এখানে কোনও পতাকা দেখবেন না। আমি যদি পতাকা টাঙাতে বলতাম, তাহলে আমার নিজের এলাকাতেই আগে দেখা যেত।’

ভিডিওতে দেয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, সেটি ছিল ফুটবলকে কেন্দ্র করে। তার ভাষায়, ‘অমুসলিম দেশগুলোর পতাকা এভাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা ঠিক নয়। আমি বলেছিলাম, আমাদের ভাইদের অনেকে সাংস্কৃতিকভাবে এর প্রতিরোধ হিসেবে কালেমার পতাকা টাঙাচ্ছেন। আপনারাও চাইলে তা করতে পারেন।’

তিনি বলেন, কালেমাখচিত পতাকা নিয়ে এত বড় শোভাযাত্রা হবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি। তার দাবি, ‘আমি শুধু যারা পতাকা টাঙিয়েছেন, তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে চেয়েছি। এটি ছিল আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক জায়গা থেকে। এত বড় আকারে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়বে, তা ভাবিনি।’

সারা দেশে মোটরসাইকেল র্যালি বা বিভিন্ন স্থানে পতাকা টাঙানোর পেছনে কারা রয়েছেন, তা তিনি ব্যক্তিগতভাবে জানেন না বলেও দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘যদি কোনও সন্দেহজনক বিষয় থাকে, প্রশাসন তদন্ত করুক। আমরা সহযোগিতা করব এবং করছি।’

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর হুমকির অভিযোগ: ঢাকার মাল্টিমিডিয়া প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা স্ট্রিম’ গত ২৩ ও ২৪ জুন ‘সাদা-কালো পতাকার নেপথ্যে কারা?’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক ও প্রকাশক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ বলেন, মানুষের আগ্রহ থেকেই তারা অনুসন্ধান চালিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছিলেন। যারা পতাকা টাঙিয়েছেন, তারাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ করে বিষয়টি প্রচার করেছিলেন। সেসব তথ্য অনুসন্ধান করেই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।

তার অভিযোগ, প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন থেকেই হুমকি আসতে শুরু করে। তিনি বলেন, অফিসের টেলিফোনে একদিনে শতাধিক কল আসে। ফেসবুক পেজে প্রায় ১৮ হাজার মন্তব্যের বেশির ভাগই ছিল গালাগালি ও হুমকি। এর মধ্যে হত্যার হুমকিও ছিল। অফিসে আগুন দেয়া ও পুড়িয়ে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়েছে, যা এখনও চলছে।

হত্যার হুমকির ঘটনায় কলাবাগান থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে কালেমাখচিত পতাকা ওড়ানোর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থান জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, পুরো বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ. এইচ. এম. শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘কোনো পতাকা বা প্রতীক যদি নিষিদ্ধ বা উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ বহন করে কিংবা জননিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে অবস্থান জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন বলেন, কালেমাখচিত পতাকা বা অন্যান্য ধর্মীয় প্রতীককে ঘিরে কোনও ধরনের বিভ্রান্তি, অবমাননা বা রাজনৈতিক অপব্যবহার কাম্য নয়। তিনি বলেন, এ ধরনের যেকোনও অপচেষ্টা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

কালেমাখচিত পতাকা নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে আলেম-ওলামা, শিক্ষাবিদ, ধর্মপ্রাণ মানুষসহ সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বানও জানান তিনি।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!