বিদেশে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নিশ্চিত করাই শেষ ধাপ নয়। ভিসা না পেলে ক্লাসের সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে, জমা দেওয়া টাকা আটকে যেতে পারে, আর পরের শিক্ষাবর্ষের পরিকল্পনাও বদলে যায়। অস্ট্রেলিয়ার সর্বশেষ ছাত্রভিসা পরিসংখ্যান নিয়ে ২৬ অক্টোবর টাইমস হায়ার এডুকেশনের প্রতিবেদনে এমনই একটি উদ্বেগজনক ছবি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার ৭৩০ জন আবেদনকারী ভিসা পেয়েছিলেন; এ বছরের সেপ্টেম্বরে পেয়েছেন মাত্র ১৪ জন। একটি মাসের তুলনায় এত বড় পতন কেন, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
সংখ্যাটি বোঝার সময় দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে। এটি অস্ট্রেলিয়ায় থাকা সব বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয়। এটি নির্দিষ্ট মাসে, উচ্চশিক্ষার জন্য, দেশের বাইরে থেকে করা আবেদনে মঞ্জুর হওয়া ভিসার হিসাব। আবার ভিসা মঞ্জুরের সংখ্যা কমার কারণ শুধু প্রত্যাখ্যান নয়; আবেদন কমলেও মঞ্জুরের মোট সংখ্যা কমে। প্রতিবেদনটিতে দুই প্রবণতার কথাই আছে: বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার ভিসা আবেদনের সংখ্যা আগের বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৪৩ শতাংশ কমেছে, আর ইস্যু করা ভিসা কমেছে ৪২ শতাংশ। ফলে বিষয়টি একই সঙ্গে নীতির ও শিক্ষার্থীদের আস্থার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের হারও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, গত বছর যেখানে হার ছিল ১০ শতাংশের নিচে, সেখানে এবার বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে তা ৭৮ শতাংশ। নেপালের ক্ষেত্রে ৮৩ শতাংশ। এই হার কোনও একজন আবেদনকারীর ব্যক্তিগত ফল নির্ধারণ করে না। যোগ্যতা, অর্থের উৎস, কোর্স নির্বাচন ও নথির সত্যতা আলাদাভাবে যাচাই হয়। তাই পরিসংখ্যান দেখে ‘সব বাংলাদেশি আবেদন বাতিল হচ্ছে’ বলা যেমন ভুল, তেমনি প্রবণতাটিকে তুচ্ছ করাও ভুল।
সমস্যাটি দক্ষিণ এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশে দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে ভারতীয় উচ্চশিক্ষা আবেদনকারীদের ভিসা মঞ্জুর হয়েছে ১৯০টি, আগের বছর একই মাসে ছিল ১,৪২২টি। নেপালে ১,০৭৪ থেকে নেমে ৮৭, ভুটানে ৮২ থেকে ৯। অন্যদিকে চীনা আবেদনকারীদের ভিসা মঞ্জুরের হার এখনও ৯০ শতাংশের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও চীন থেকেও নতুন আবেদন কমেছে। এসব দেশের তুলনা নীতির প্রভাব বুঝতে সাহায্য করে, কিন্তু জাতীয়তা একাই কোনও আবেদন মঞ্জুর বা প্রত্যাখ্যানের একমাত্র ব্যাখ্যা নয়।
অস্ট্রেলিয়ার সরকার আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়ম ঠেকাতে এবং প্রকৃত শিক্ষার্থী যাচাইয়ে নিয়ম কঠোর করেছে। তার সরকারি ভিসা পাতায় ২ অক্টোবর থেকে নতুন বিধি কার্যকর হওয়ার কথাও দেওয়া আছে। তবে নিয়ম কঠোর করার উদ্দেশ্য আর তার বাস্তব ফল এক জিনিস নয়। সঠিক শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তায় পড়ছেন কি না, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি পরিকল্পনা বদলাচ্ছে কি না, এবং আবেদনকারীরা অন্য দেশে সরে যাচ্ছেন কি না—এসব তথ্য দিয়ে বিচার করতে হবে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংগঠনের প্রধান ফিল হানিউড এই কঠোরতাকে অতিরিক্ত বলে সমালোচনা করেছেন; এটি তাঁর মূল্যায়ন, সরকারি স্বীকারোক্তি নয়।
বাংলাদেশি পরিবারের জন্য সবচেয়ে বাস্তব প্রশ্ন, এখন কী করবেন? কোনও এজেন্টের ‘নিশ্চিত ভিসা’ প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করার আগে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র বিভাগের সরকারি নিয়ম, যোগ্যতার শর্ত ও চলতি প্রক্রিয়াকরণ তথ্য পড়া প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার, টিউশন ফি ফেরতের শর্ত, বাসস্থান এবং ক্লাস শুরুর সময়সীমা লিখিতভাবে যাচাই করতে হবে। নথিতে ভুল বা অসংগতি থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে; আবার নিখুঁত নথি জমা দিলেই অনুমোদন নিশ্চিত হয় না। আবেদনের আগে বিকল্প শিক্ষার পরিকল্পনা রাখা বাস্তবসম্মত।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও প্রশ্নটি সহজ নয়। বিদেশি শিক্ষার্থীর ফি অনেক প্রতিষ্ঠানের আয়ের বড় অংশ। নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের আবেদন হঠাৎ কমে গেলে কোর্স, কর্মী এবং গবেষণার ব্যয়ে প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে সরকার মনে করতে পারে, শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কোন অবস্থান কতটা কার্যকর, তা বোঝার জন্য আরও কয়েক মাসের তথ্য, প্রত্যাখ্যানের কারণ এবং সফল শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা দরকার। এক মাসের সংখ্যা দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যদ্বাণী নয়, তবে শক্তিশালী সতর্কসংকেত।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সুনির্দিষ্ট তথ্যের দিকে তাকানো। সেপ্টেম্বরে ১৪টি মঞ্জুরি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশীদের জন্য বড় ধাক্কার ইঙ্গিত দেয়। পরের মাসগুলোতে আবেদন, সিদ্ধান্ত ও প্রত্যাখ্যানের হার কীভাবে বদলায়, সেটিই বলবে পরিস্থিতি সাময়িক চাপ, নাকি দীর্ঘস্থায়ী নতুন বাস্তবতা।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!