উৎসবের রঙে সাজছে...
টেকনোলজি

চীনের গুহায় ১ লাখ ৬৭ হাজার বছর পুরোনো জীবনের চিহ্ন, মিলল রহস্যময় মানবগোষ্ঠীর হদিস

চীনের গুহায় ১ লাখ ৬৭ হাজার বছর পুরোনো জীবনের চিহ্ন, মিলল রহস্যময় মানবগোষ্ঠীর হদিস
লেখা বড়/ছোট করুন:

চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুহায় খনন চালিয়ে রহস্যময় প্রাচীন মানবগোষ্ঠী ডেনিসোভানদের নতুন জীবাশ্মের সন্ধান পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। আবিষ্কৃত নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে চারটি দাঁত, একটি বাহুর হাড়ের অংশ এবং খুলির দুটি টুকরা। এই আবিষ্কারের ফলে এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ডেনিসোভান জীবাশ্মের সংখ্যা ২০ ছাড়িয়েছে। খবর সিএনএনের।

গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কারটি হয়েছে চীনের ইউনান প্রদেশের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত বিয়ানফু গুহায়। গবেষকদের মতে, গুহাটি ডেনিসোভানদের জীবনযাপন সম্পর্কে নতুন তথ্য জানার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান হয়ে উঠতে পারে।

জীবাশ্মের পাশাপাশি গুহা থেকে হাড় ও পাথরের তৈরি বিভিন্ন সরঞ্জাম, জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া পরাগকণা এবং নানা প্রাণীর দেহাবশেষও পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন থেকে ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার বছর আগে ডেনিসোভানরা ওই অঞ্চলের বনভূমিতে বসবাস করত। গবেষণার দুটি প্রতিবেদন বুধবার বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার'-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকদের জন্য এই আবিষ্কার সহজ ছিল না। চীনের ইনস্টিটিউট অব টিবেটান প্ল্যাটো রিসার্চের গবেষক হাও লি জানান, প্রথমে বিচ্ছিন্ন কিছু দাঁত পাওয়া যায়। এরপর গুহা থেকে পাওয়া বিপুল পরিমাণ প্রাণীর হাড়ের মধ্য থেকে মানুষের হাড়ের সম্ভাব্য অংশগুলো খুঁজে বের করতে হয়।

প্রায় ৬০ হাজার হাড়ের টুকরা পরীক্ষা করে গবেষকেরা এমন দুই ডজনের মতো টুকরা শনাক্ত করেন, যেগুলো মানবগোষ্ঠীর হাড়ের সঙ্গে মিল রয়েছে বলে মনে হয়। পরে এসবের মধ্যে কোনোটিতে প্রাচীন জৈব-অণুর চিহ্ন রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়।

গবেষকেরা জীবাশ্মগুলোর মধ্যে প্রাচীন ডিএনএ খুঁজে পাননি। তবে তিনটি হাড় ও দুটি দাঁতে এমন কিছু অ্যামাইনো অ্যাসিডের বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে, যা সেগুলোকে ডেনিসোভানদের বলেই মনে করছেন তারা। গবেষকদের মতে, এক লাখ বছরের বেশি পুরোনো জীবাশ্মে ডিএনএ টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। তার ওপর ইউনান অঞ্চলের তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়াও ডিএনএ সংরক্ষণের জন্য প্রতিকূল ছিল।

তবে দুটি দাঁত এতটাই ভঙ্গুর ছিল যে সেগুলো পরীক্ষাগারে নমুনা হিসেবে নেয়া সম্ভব হয়নি। দাঁতের আকৃতি এবং আগে পাওয়া ডেনিসোভান দাঁতের সঙ্গে তুলনা করে সেগুলোকেও ডেনিসোভানদের বলে শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা।

ডেনিসোভানরা প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর একটি রহস্যময় শাখা। ২০১০ সালে সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহায় পাওয়া একটি ছোট আঙুলের হাড় থেকে উদ্ধার করা প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ করে প্রথমবার এই গোষ্ঠীর অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়। এটি ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। কারণ, কোনো নতুন মানবগোষ্ঠীকে প্রথমবার মূলত ডিএনএর ভিত্তিতে শনাক্ত করা হয়েছিল।

তবে ডেনিসোভা গুহায় একই সময়ে নিয়ান্ডারথাল, ডেনিসোভান এবং আধুনিক মানুষ; হোমো স্যাপিয়েন্স উপস্থিত ছিল। ফলে সেখানে পাওয়া নিদর্শন দেখে ডেনিসোভানরা ঠিক কীভাবে জীবনযাপন করত, তা নিশ্চিতভাবে বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

গবেষণায় পাওয়া প্রাণীর হাড় ও পাথরের সরঞ্জামের ওপর থাকা বিভিন্ন ক্ষতচিহ্ন বিশ্লেষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাতে দেখা গেছে, ডেনিসোভানরা পাথর ও হাড় দিয়ে সরঞ্জাম তৈরি করত এবং বড় আকারের প্রাণী শিকার করত। এসব প্রাণীর মধ্যে ছিল জলমহিষ, গাউর (অনেকটা বন্য গরুর মতো) এবং লাল ও সিকা হরিণ। গুহার আশপাশের বনভূমিতে এসব প্রাণীর বসবাস ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু মাংস নয়, প্রাণীর হাড় থেকে মজ্জাও সংগ্রহ করত ডেনিসোভানরা। অর্থাৎ প্রাণী শিকারের পর তার দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করত তারা।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, ডেনিসোভানরা একসময় এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিল। বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ওশেনিয়ার অনেক মানুষের জিনে ডেনিসোভানদের ডিএনএর চিহ্ন পাওয়া যায়। এর অর্থ হলো, বহু হাজার বছর আগে ডেনিসোভানদের সঙ্গে আধুনিক মানুষের আন্তঃপ্রজনন ঘটেছিল।

তবে এতদিন অধিকাংশ ডেনিসোভান জীবাশ্ম পাওয়া গেছে এশিয়ার উত্তরাঞ্চলে। বিয়ানফু গুহার আবিষ্কার সেই চিত্র বদলে দিচ্ছে। এটি এমন তৃতীয় স্থান, যেখানে ডেনিসোভানদের বসবাসের নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এর আগে সাইবেরিয়ার ডেনিসোভা গুহা এবং তিব্বত মালভূমির একটি স্থান থেকে তাদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। নতুন আবিষ্কারটি দেখাচ্ছে, ডেনিসোভানরা শুধু ঠান্ডা ও উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে নয়, তুলনামূলক উষ্ণ ও জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশেও বসবাস করতে সক্ষম ছিল।

ডেনিসোভানদের সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান এখনো খুব সীমিত। গত বছর পর্যন্ত তাদের চেহারা সম্পর্কেও তেমন কোনো ধারণা ছিল না। কারণ, এতদিন পাওয়া বেশিরভাগ জীবাশ্মই ছিল ছোট ছোট হাড়ের টুকরা। ২০২৫ সালে অবশ্য গবেষক কিয়াওমেই ফু ও তার সহকর্মীরা চীনের হারবিন শহর থেকে পাওয়া একটি বিশাল খুলির ওপর গবেষণা প্রকাশ করেন। 'ড্রাগন ম্যান' নামে পরিচিত ওই খুলিটি বহু বছর একটি কূপের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

জেনেটিক উপাদান বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা সেটিকে ডেনিসোভানদের সঙ্গে যুক্ত করেন। এর ফলে প্রথমবারের মতো এই রহস্যময় মানবগোষ্ঠীর চেহারা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা একটি ধারণা পান। গবেষকেরা ওই গোষ্ঠীর জন্য 'হোমো লংগি' নামটিও প্রস্তাব করেছেন।

তবু অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। ডেনিসোভানরা দেখতে কেমন ছিল? তারা কীভাবে জীবনযাপন করত? আধুনিক মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ ছিল? আর শেষ পর্যন্ত তারা কেন পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল? বিয়ানফু গুহা হয়তো এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর দিতে পারে।

ইউনান অঞ্চল প্রাচীন মানবগোষ্ঠীগুলোর জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তারও একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে। এ অঞ্চল জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এবং এখানে উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রচুর উৎস ছিল। পাশাপাশি এটি তিব্বত মালভূমির প্রান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় উত্তর ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এক ধরনের প্রাকৃতিক সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করতে পারে।

গবেষকদের মতে, প্রায় ২ হাজার মিটার উচ্চতার এই অঞ্চলটি খুব বেশি উঁচু নয়, আবার সম্পূর্ণ সমতলও নয়। ফলে প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর বসবাসের জন্য এটি ছিল তুলনামূলকভাবে অনুকূল পরিবেশ। এই অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও বেশ কিছু প্রস্তরযুগের প্রত্নস্থল আবিষ্কৃত হয়েছে। এমনকি প্রায় ৩ লাখ বছর আগের বিরল কাঠের সরঞ্জামও পাওয়া গেছে। তাই গবেষকদের আশা, ইউনানের মাটির নিচে এখনো ডেনিসোভানদের জীবন ও বিলুপ্তির ইতিহাসের আরও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র লুকিয়ে থাকতে পারে।


আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!