উৎসবের রঙে সাজছে...
অন্যান্য

গরমে মৃত্যুর হিসাব এত দ্রুত বাড়ছে কেন? নতুন বৈশ্বিক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যের বিপদ কোথায়

গরমে মৃত্যুর হিসাব এত দ্রুত বাড়ছে কেন? নতুন বৈশ্বিক প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যের বিপদ কোথায়
লেখা বড়/ছোট করুন:

প্রচণ্ড গরমকে অনেকেই অস্বস্তিকর আবহাওয়া বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু একটি নতুন বৈশ্বিক প্রতিবেদন দেখাচ্ছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ক আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালের ল্যানসেট কাউন্টডাউন রিপোর্টের ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৮ অক্টোবরের বিবরণ অনুযায়ী, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির পরের বছরগুলোতে গরমের সঙ্গে সম্পর্কিত বার্ষিক গড় মৃত্যুর সংখ্যা আগের দশকের তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩ সালে গরমের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর অনুমিত সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ লাখ ১০ হাজার। এটি একটি বৈশ্বিক গবেষণাভিত্তিক অনুমান, প্রতিটি মৃত্যুর সনদে গরম লেখা আছে—এমন নয়।

প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন বহু দেশের গবেষকেরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ৭১টি প্রতিষ্ঠানের ১৪৬ জন বিশেষজ্ঞ ৫৪টি সূচক বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে তাপ, খরা, ভারী বৃষ্টিপাত, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা, কাজের সক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি আছে। এত সূচক একসঙ্গে দেখার কারণ স্পষ্ট: জলবায়ু পরিবর্তন শুধু তাপমাত্রার সংখ্যা নয়, মানুষের শরীর ও দৈনন্দিন জীবনের নানা পথে আঘাত করে। একটি গরম দিনের প্রভাব বয়স, পেশা ও বাসস্থানের ওপরও নির্ভর করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সারাংশে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের গরমজনিত মৃত্যুর অনুমিত সংখ্যার ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এমন ভাগ নির্ধারণ করা হয় তুলনামূলক জলবায়ু মডেল দিয়ে: মানবসৃষ্ট উষ্ণায়ন ছাড়া তাপমাত্রা ও মৃত্যুঝুঁকি কতটা হতে পারত, তার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি মিলিয়ে। এটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, কিন্তু নির্ভুল ব্যক্তিগত মৃত্যুর তালিকা নয়। পাঠকের জন্য এই সীমা জানা জরুরি, যাতে সংখ্যার গুরুত্বও বোঝা যায়, আবার হিসাবের প্রকৃতিও ভুল না হয়।

তাপের ক্ষতি শুধু সরাসরি হিটস্ট্রোক নয়। দীর্ঘ সময় গরমে থাকলে হৃদ্‌রোগ, শ্বাসকষ্ট বা কিডনির সমস্যায় থাকা মানুষ বেশি বিপদে পড়তে পারেন। বাইরের শ্রমিকেরা কাজ থামাতে না পারলে শরীর ঠান্ডা করার সুযোগ কমে। ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস, পানি বা শীতল থাকার ব্যবস্থা না থাকলে রাতের গরমও বিপজ্জনক হতে পারে। তাই ঝুঁকি সবার সমান নয়। দরিদ্র মানুষ, বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং আগে থেকে অসুস্থ মানুষের জন্য স্থানীয় প্রস্তুতি আলাদা গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশের মতো উষ্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশে খবরটির বাস্তব অর্থ আছে। শহরের কংক্রিট, যানজট, কম গাছ এবং ভিড়ের বাড়ি তাপের চাপ বাড়াতে পারে। গ্রামের কৃষিকাজ বা নির্মাণক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় রোদে থাকার ঝুঁকি আছে। তবে বৈশ্বিক মৃত্যুর সংখ্যাকে সরাসরি বাংলাদেশের মৃত্যু হিসেবে দেখানো যাবে না। স্থানীয় ঝুঁকি বুঝতে দেশের তাপমাত্রা, স্বাস্থ্যতথ্য এবং কর্মপরিবেশের আলাদা গবেষণা চাই। বিশ্ব প্রতিবেদন প্রশ্নটি সামনে আনে; দেশের জন্য উত্তর তৈরি করতে স্থানীয় তথ্য প্রয়োজন।

গরমের বিপদ ঠেকাতে আবহাওয়ার আগাম সতর্কতা একটি উপায়। কিন্তু সতর্কবার্তা মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং সে অনুযায়ী আচরণ বদলানোর সুযোগ থাকা সমান জরুরি। দিনমজুরকে ‘দুপুরে বাইরে যাবেন না’ বলা সহজ, কিন্তু কাজ বন্ধ করলে আয় হারানোর প্রশ্ন থাকে। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও কর্মস্থলে পানির ব্যবস্থা, বিশ্রামের সুযোগ এবং জরুরি চিকিৎসার পরিকল্পনা দরকার। স্বাস্থ্যনীতি ও শ্রমনীতি এখানে আলাদা বিষয় নয়। শুধু ব্যক্তিগত সাবধানতা দিয়ে কাঠামোগত ঝুঁকি কাটানো যায় না।

প্রতিবেদন খরা ও পানিসংক্রান্ত চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিও দেখিয়েছে। খরায় খাদ্য উৎপাদন ও পানির প্রাপ্যতা কমতে পারে; অতিবৃষ্টিতে বন্যা ও পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা বাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যপ্রভাব তাই এক এলাকায় গরম, আরেক এলাকায় খাদ্যসংকট বা সংক্রমণের আকারে দেখা যায়। যে দেশগুলো সবচেয়ে কম দূষণ তৈরি করেছে, তাদের অনেকেই এসব ক্ষতির মুখে বেশি অরক্ষিত। বৈশ্বিক ন্যায্যতা নিয়ে আলোচনায় স্বাস্থ্যক্ষতি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে উঠছে।

তবে প্রতিবেদনে শুধু বিপদের কথা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ২০২৫ সালে পরিচ্ছন্ন শক্তিতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ রেকর্ড ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। কিছু দেশে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বায়ুদূষণ কমায় অকালমৃত্যু এড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা ও আগাম সতর্কতায় অগ্রগতি আছে। কিন্তু গবেষকদের মূল্যায়ন, এই ইতিবাচক পদক্ষেপ এখনো বাড়তে থাকা ক্ষতি সামলানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

একটি কঠিন বিষয় হলো জলবায়ু আলোচনা প্রায়ই ভবিষ্যৎ শতকের হিসাব দিয়ে চলে, অথচ স্বাস্থ্যক্ষতি এখনকার। ২০২৩ সালের তাপজনিত মৃত্যুর অনুমান সেই বর্তমানকে সামনে আনে। নীতিনির্ধারকের জন্য প্রশ্ন, কত দ্রুত দূষণ কমানো যায় এবং একই সঙ্গে ইতিমধ্যে বাড়া গরমে মানুষকে কীভাবে রক্ষা করা যায়। নির্গমন কমানো দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা; পানি, ছায়া, কর্মঘণ্টা ও চিকিৎসা প্রস্তুতি তাৎক্ষণিক সুরক্ষা। দুই ধরনের কাজই দরকার।

গরমের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর হিসাব তাই একটি সতর্ক সংকেত। এর পেছনে মডেল ও অনিশ্চয়তা আছে, কিন্তু এত গবেষকের সম্মিলিত কাজকে সাধারণ আবহাওয়ার ওঠানামা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সামনে জলবায়ু সম্মেলন থাকলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার কাজ স্থানীয় সরকার, হাসপাতাল, নিয়োগকর্তা এবং পরিবারের পর্যায়ে আজ থেকেই শুরু হতে পারে। সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, পরের তাপপ্রবাহের আগে কারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছেন, এবং তাদের রক্ষার ব্যবস্থা সত্যিই পৌঁছাচ্ছে কি না।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!