উৎসবের রঙে সাজছে...
আন্তর্জাতিক

নির্বাচনি ফল প্রকাশ, এবার কোন পথে ইসরায়েলের রাজনীতি

নির্বাচনি ফল প্রকাশ, এবার কোন পথে ইসরায়েলের রাজনীতি
লেখা বড়/ছোট করুন:

ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। এখন এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুরু হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষি।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট—দুই পক্ষের সামনেই সরকার গঠনের কঠিন সমীকরণ। নির্বাচনে কোনো শিবিরই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে ঐতিহাসিকভাবে ১৯টি আসন পাওয়া আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো সরকার গঠনে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে সরকার গঠনের যেকোনো সমঝোতায় দলগুলোকে নিজেদের ভোটারদের কাছে অজনপ্রিয় এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে আগামী বছরের শুরুর দিকে আবার নির্বাচন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। সরকার গঠনের সম্ভাব্য তিনটি পরিস্থিতি সামনে এসেছে।

প্রথমত, আইজেনকটের সঙ্গে আরব দলগুলোর জোট। সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে সহজ সমাধান হতে পারে আইজেনকটের সঙ্গে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর জোট। এ দুই পক্ষ এক হলে নেতানিয়াহুবিরোধী ৬৭ আসনের একটি শক্তিশালী জোট গঠন সম্ভব। আর আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে যোগ না দিলেও সংখ্যালঘু সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পারে। তবে আইজেনকট ও তার ইহুদি মিত্রদের জন্য এ সমীকরণ রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব নাগরিক। তারা মূলত ফিলিস্তিনি, যাদের পরিবারের সদস্যরা ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পর ইসরায়েলে থেকে গিয়েছিলেন। পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও দাবির প্রতিও তাদের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। এ কারণে অনেক ইহুদি ইসরায়েলি তাদের সন্দেহের চোখে দেখেন। ইসরায়েলের ইতিহাসে মাত্র একবার কোনো আরব দল সরকারে যোগ দিয়েছিল। ২০২১ সালে গঠিত সেই সরকার টিকেছিল প্রায় ১৮ মাস।

নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে আরব দলগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য জোটকে ইসরায়েলের ইহুদি পরিচয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরছেন। এতে আইজেনকটের মিত্রদের, বিশেষ করে ডানপন্থী দলগুলোর ওপর এমন জোট প্রত্যাখ্যানের চাপ বাড়ছে

দ্বিতীয়ত, জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের চেষ্টা। আরেকটি সম্ভাবনা হলো, আইজেনকট ও তার ডানঘেঁষা মিত্রদের সঙ্গে সমঝোতা করে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করতে পারেন নেতানিয়াহু। এ ধরনের জোট হলে নেতানিয়াহুর পক্ষে ৬৭ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর পাশাপাশি কট্টর জাতীয়তাবাদী ও অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলো বিরোধী শিবিরে চলে যাবে।

এমন সরকার অতি-গোঁড়া ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের অর্থনীতি শক্তিশালী করার উদ্যোগও নিতে পারে। তবে এ সমঝোতায় উভয় পক্ষকেই নিজেদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করে আসছেন আইজেনকট ও তার মিত্ররা। তাদের অভিযোগ, নেতানিয়াহু ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির বিচার নিয়েও আপত্তি রয়েছে বিরোধী শিবিরের। আইজেনকট ও তার সহযোগীরা আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই সরকারে তারা থাকবেন না।

তৃতীয়ত, বিরোধী শিবির থেকে নেতা ভাঙানোর চেষ্টা। বিরোধী জোটের মধ্যে দুর্বলতা খুঁজে বের করে সেখান থেকে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। কারণ, এ জোটে ইসরায়েলের রাজনৈতিক বর্ণালির বিভিন্ন মতাদর্শের দল রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাবেক মিত্র ডানপন্থী নেতা নাফতালি বেনেট কিংবা আভিগদর লিবারম্যানকে নিজের দিকে টানার চেষ্টা করতে পারেন তিনি।

তবে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক নানা বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। দুজনই তার সঙ্গে জোটে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে বিরোধী শিবির থেকে সমর্থক ভাঙিয়ে আনার ক্ষেত্রে আইজেনকটের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম। কারণ, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং তার কট্টর ডানপন্থী ও অতি-গোঁড়া ইহুদি মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে তার প্রতি অনুগত।

কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে আগামী বছরের শুরুতে ইসরায়েলে আবার নির্বাচন হতে পারে। নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। ইসরায়েলের রাজনৈতিক অচলাবস্থার নজির অবশ্য আগেও রয়েছে। ২০১৯ সালে একই ধরনের অচলাবস্থার পর সাড়ে তিন বছরের মধ্যে দেশটিতে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে এবারের নির্বাচনের পরও দ্রুত রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে ইসরায়েল আবারও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।


আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!