ক্যানসারের নতুন ওষুধ নিয়ে বড় সংখ্যার শিরোনাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সংখ্যাটি আসলে কী মেপেছে, কাদের ওপর পরীক্ষা হয়েছে, আর রোগীরা কত দিন বেঁচেছেন—এই প্রশ্নগুলো আলাদা। ২৫ অক্টোবর নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত একটি তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় নির্দিষ্ট ধরনের অগ্রসর ফুসফুসের ক্যানসারে নতুন ওষুধের সমন্বয় নিয়ে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। গবেষণায় নতুন চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ক্যানসার না বাড়ার মধ্যম সময় ছিল ১৫ মাস; তুলনামূলক প্রচলিত চিকিৎসায় ৫ দশমিক ৭ মাস। এই ফল গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটিকে ক্যানসার সেরে যাওয়ার প্রমাণ বলা যাবে না।
গবেষণাটি ছিল পিডি-এল১ নেগেটিভ, অগ্রসর, নন-স্কোয়ামাস নন-স্মল সেল ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে। অংশগ্রহণকারীদের এমন লক্ষ্যযোগ্য জিনগত পরিবর্তন ছিল না, যার জন্য আলাদা লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ দেওয়া যায়। মোট ৪৫৫ জনকে দৈবভাবে দুই দলে ভাগ করা হয়। এক দলে ২২৯ জন পেয়েছেন স্যাকিটুজুম্যাব টিরুমোটেকান ও পেমব্রোলিজুম্যাব। অন্য দলে ২২৬ জন পেয়েছেন প্লাটিনাম ও পেমেট্রেক্সেডভিত্তিক কেমোথেরাপির সঙ্গে পেমব্রোলিজুম্যাব। ফলে নতুন পদ্ধতিটি পরীক্ষা করা হয়েছে একটি প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসার বিপরীতে, কোনও চিকিৎসাহীন দলের সঙ্গে নয়।
‘ক্যানসার না বাড়ার মধ্যম সময়’ কথাটির অর্থ বুঝতে হবে। গবেষকেরা দেখেছেন, চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর ক্যানসার আবার বাড়তে বা রোগী মারা যেতে কত সময় লাগছে। দুই দলের মধ্যম সময়ের পার্থক্য ছিল বড়। কিন্তু এর মানে প্রতিটি রোগী ঠিক ১৫ মাস ভালো ছিলেন, এমন নয়। কারও সময় কম, কারও বেশি হতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, এই সূচকটি মোট আয়ু নয়। গবেষণার সময় রোগীরা সামগ্রিকভাবে কত দিন বেঁচেছেন, সে বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য তখনও পরিপক্ব হয়নি।
নতুন সমন্বয়ের একটি ওষুধ স্যাকিটুজুম্যাব টিরুমোটেকান একটি অ্যান্টিবডি-ড্রাগ কনজুগেট। সহজ ভাষায়, এটি ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ওষুধ পৌঁছানোর কৌশল ব্যবহার করে। কিন্তু লক্ষ্যভিত্তিক বলেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, এমন ধারণা ভুল। পরীক্ষায় চিকিৎসা শুরুর পর গুরুতর মাত্রার বিরূপ ঘটনা নতুন দলে ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং তুলনামূলক দলে ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ রোগীর মধ্যে দেখা গেছে। সংখ্যায় নতুন দলের হার কম হলেও প্রায় অর্ধেক রোগীর গুরুতর সমস্যা হয়েছে—এই তথ্যও সমান গুরুত্ব পায়।
গবেষণার মধ্যম অনুসরণকাল ছিল মাত্র ৯ দশমিক ৭ মাস। তাই ১৫ মাসের ক্যানসার না বাড়ার ফলটি পরিসংখ্যানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরও দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। ফল অন্য দেশের রোগী, অন্য ধরনের ফুসফুসের ক্যানসার বা আগেই একাধিক চিকিৎসা নেওয়া মানুষের ক্ষেত্রে একই হবে কি না, তা এই গবেষণা একা বলে না। রোগ নির্ণয়ে পিডি-এল১ অবস্থা, টিউমারের ধরন এবং জিনগত পরীক্ষা জরুরি। এসব ছাড়া নতুন ওষুধ কার জন্য উপযুক্ত তা নির্ধারণ করা যায় না।
আরেকটি বিষয় হলো গবেষণার অর্থায়ন। প্রকাশিত প্রবন্ধ অনুযায়ী এটি সিচুয়ান কেলুন-বায়োটেক বায়োফার্মাসিউটিক্যালের অর্থায়নে হয়েছে। শিল্পের অর্থায়ন নিজে ফল বাতিল করে না, তবে স্বাধীন মূল্যায়ন, পূর্ণ তথ্য এবং পরবর্তী পরীক্ষার গুরুত্ব বাড়ায়। চিকিৎসা পদ্ধতি বদলাতে ওষুধ নিয়ন্ত্রকের অনুমোদন, চিকিৎসকদের নির্দেশিকা এবং বাস্তব ব্যবহারের নিরাপত্তা তথ্যও বিবেচনা করতে হয়। একটি জার্নাল প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়া মানেই সব দেশে ওষুধটি এখনই পাওয়া যাচ্ছে, এমন নয়।
বাংলাদেশে ফুসফুসের ক্যানসারের রোগী বা তাঁদের পরিবার এই খবর দেখে চিকিৎসা বদলানোর সিদ্ধান্ত নিলে ঝুঁকি আছে। চিকিৎসার ধরন নির্ভর করে রোগের পর্যায়, টিউমারের বৈশিষ্ট্য, আগের চিকিৎসা এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। নতুন পরীক্ষার ফল নিয়ে ক্যানসার বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে; চলতি ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করা উচিত নয়। বাস্তব প্রশ্ন হলো, পরীক্ষার উপযোগী রোগী চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা পাওয়া এবং সম্ভাব্য খরচ সামলানো।
সব মিলিয়ে ফলটি আশার জায়গা তৈরি করেছে, কারণ নির্দিষ্ট রোগী দলের জন্য ক্যানসার না বাড়ার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু পরীক্ষার প্রধান ফল আর রোগ সারিয়ে তোলার প্রতিশ্রুতি এক নয়। পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি তথ্যই জানাবে, এই অগ্রগতি রোগীদের মোট আয়ু ও দৈনন্দিন জীবনে কতটা স্থায়ী লাভ এনে দেয়।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!