একই রোগে আক্রান্ত দুই মানুষের টিউমার দেখতে কাছাকাছি হলেও জিনগত পরিবর্তন এক নাও হতে পারে। সেই পার্থক্য ধরে ব্যক্তির জন্য আলাদা চিকিৎসা তৈরির ধারণা বহুদিনের। এবার মেলানোমা নামের ত্বকের ক্যানসারে পরীক্ষামূলক একটি ব্যক্তিকৃত এমআরএনএ টিকা নিয়ে বড় গবেষণার ফল নতুন আশা দেখিয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর প্রচলিত ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে টিকাটি পাওয়া রোগীদের ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু এটি এখনো পরীক্ষামূলক চিকিৎসা; সাধারণ মানুষের জন্য অনুমোদিত ক্যানসার প্রতিষেধক হিসেবে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৃতীয় পর্যায়ের আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় উচ্চ ঝুঁকির মেলানোমা অপসারণ করা এক হাজার একশোর বেশি রোগী অংশ নেন। সবাই প্রচলিত ওষুধ পেমব্রোলিজুম্যাব, যা কিট্রুডা নামে পরিচিত, পেয়েছিলেন। গবেষণার একটি দল তার সঙ্গে ব্যক্তিকৃত টিকা পেয়েছে; অন্য দল পেয়েছে প্লাসেবো। এই তুলনার কারণেই বিজ্ঞানীরা বাড়তি চিকিৎসার সম্ভাব্য উপকার মূল্যায়ন করতে পেরেছেন। গবেষণাটি চিকিৎসা শেষে রোগ ফেরার ঝুঁকি নিয়ে, সুস্থ মানুষের ক্যানসার হওয়া আটকানো নিয়ে নয়।
মডার্নার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত মূল বিশ্লেষণে টিকা ও পেমব্রোলিজুম্যাব একসঙ্গে পাওয়া দলে রোগ ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি একা পেমব্রোলিজুম্যাব পাওয়া দলের তুলনায় ৪২ শতাংশ কম ছিল। এটি ‘প্রতিটি রোগীর ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমেছে’ এমন সরল অর্থে বলা উচিত নয়; গবেষণায় ব্যবহৃত তুলনামূলক পরিমাপের ফল এটি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস দুই বছরের পর্যবেক্ষণে রোগ ফিরে না আসার অনুপাত ৮২ শতাংশ বনাম ৭০ শতাংশ জানিয়েছে। সংখ্যাগুলো সম্ভাবনা দেখালেও দীর্ঘমেয়াদি ফল আরও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
ব্যক্তিকৃত টিকাটি তৈরি হয় রোগীর টিউমারের জিনগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে। গবেষকেরা এমন পরিবর্তন শনাক্ত করেন, যেগুলো থেকে তৈরি অস্বাভাবিক প্রোটিনকে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা চিনতে শিখতে পারে। সেই তথ্য দিয়ে এমআরএনএ নির্দেশনা তৈরি করা হয়। লক্ষ্য হলো শরীরের প্রতিরক্ষা কোষকে টিউমারের বিশেষ চিহ্নের দিকে নজর দিতে শেখানো, যাতে অস্ত্রোপচারের পর অদৃশ্য থেকে যাওয়া ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জাগে। এই পদ্ধতি সবাইকে একই টিকা দেওয়ার ধারণা থেকে আলাদা।
পরীক্ষায় অংশ নেওয়া রোগীদের আগে অস্ত্রোপচার করে দৃশ্যমান মেলানোমা সরানো হয়েছিল। তাই ফলটি প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত হলেই এই টিকা সবার জন্য দরকার—এমন সিদ্ধান্ত সমর্থন করে না। মেলানোমার স্তর, ফেরার ঝুঁকি এবং অন্যান্য চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্ক অনুযায়ী চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত ভিন্ন হয়। বর্তমানে কারও ত্বকে সন্দেহজনক দাগ দেখা দিলে পরীক্ষামূলক টিকার খোঁজে সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই প্রয়োজন। গবেষণার খবর সরাসরি ব্যক্তিগত চিকিৎসা নির্দেশনা নয়।
নতুন পদ্ধতির বড় সীমাবদ্ধতা উৎপাদন। প্রতিটি রোগীর জন্য টিউমারের নমুনা বিশ্লেষণ, প্রয়োজনীয় জিনগত চিহ্ন বেছে নেওয়া এবং আলাদা টিকা তৈরি করতে হয়। মডার্নার কর্মকর্তাদের মতে, পুরো প্রক্রিয়া প্রায় ছয় সপ্তাহ বা কখনো তার বেশি লাগতে পারে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য এই ব্যবস্থা গড়তে খরচ, কারখানার সক্ষমতা, নমুনা পরিবহন এবং সমান প্রবেশাধিকার বড় প্রশ্ন হবে। গবেষণার সফল ফল আসলেও চিকিৎসা ব্যবস্থা তৈরি না হলে তার লাভ সবাই পাবে না।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে সাধারণ এমআরএনএ টিকায় দেখা যায় এমন বাহুতে ব্যথা ও ক্লান্তির মতো প্রতিক্রিয়ার কথা এসেছে। কিন্তু কোনো রোগীর জন্য উপকার ও ঝুঁকির হিসাব চিকিৎসককে পূর্ণ পরীক্ষার তথ্য দেখে করতে হবে। বিশেষত কিট্রুডার মতো ইমিউনোথেরাপির নিজস্ব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে; নতুন টিকা যুক্ত হলে কোন প্রতিক্রিয়া কোন চিকিৎসার কারণে হলো, সেটিও বিশ্লেষণ জরুরি। সংবাদ প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে নিরাপত্তার পূর্ণ মূল্যায়ন করা যায় না।
গবেষণাটি কেন এত মনোযোগ পাচ্ছে? ক্যানসারের বিরুদ্ধে এমআরএনএ প্রযুক্তির সম্ভাবনা কয়েক বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু বড়, তুলনামূলক পরীক্ষায় স্পষ্ট ফল পাওয়া কঠিন। মেলানোমার এই ফল সেই আলোচনাকে বাস্তব রোগীর তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তবে এক রোগের ফল অন্য ক্যানসারে নিজে থেকে প্রযোজ্য হয় না। ফুসফুস, কিডনি ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারসহ অন্য ক্ষেত্রে আলাদা পরীক্ষা চলছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের গবেষণার ফল চাই।
ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মডার্না ও মার্ক জানিয়েছে, তারা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনা করছে। অনুমোদন, ব্যবহারের শর্ত এবং মূল্য—এসবের সিদ্ধান্ত এখনো বাকি। প্রতিষ্ঠানের ঘোষণার সঙ্গে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন মিলিয়ে দেখা দরকার, কারণ কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থও আছে। একই সঙ্গে বড় র্যান্ডমাইজড পরীক্ষার ইতিবাচক ফলকে গুরুত্ব না দেওয়া উচিত নয়। প্রমাণের শক্তি ও সীমা দুটোই এখানে একসঙ্গে দেখতে হবে।
মেলানোমা রোগীর জন্য সংবাদটির সবচেয়ে সৎ সারকথা হলো: পরীক্ষামূলক ব্যক্তিকৃত টিকা চিকিৎসার নতুন পথ খুলতে পারে, কিন্তু আজই চিকিৎসা বদলে দেওয়ার লাইসেন্স নয়। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ, পূর্ণ তথ্য প্রকাশ, নিয়ন্ত্রক পর্যালোচনা এবং সবার নাগালে পৌঁছানোর পরিকল্পনা এখন পরের পরীক্ষা। এক রোগীর টিউমার থেকে বানানো টিকা ভবিষ্যতে ক্যানসার চিকিৎসার চেহারা বদলাবে কি না, তা এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই নির্ভর করবে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!