উৎসবের রঙে সাজছে...
অন্যান্য

ক্যানসার ফেরার ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমাল ব্যক্তিগত এমআরএনএ চিকিৎসা—কাদের জন্য এই ফল?

ক্যানসার ফেরার ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমাল ব্যক্তিগত এমআরএনএ চিকিৎসা—কাদের জন্য এই ফল?
লেখা বড়/ছোট করুন:

ক্যানসারের ‘টিকা’ শব্দ শুনলে অনেকের মনে হয়, সুস্থ অবস্থায় একটি ইনজেকশন নিলেই সব ধরনের ক্যানসার ঠেকানো যাবে। মেলানোমা নিয়ে নতুন গবেষণার ফল আসলে তা বলছে না। অস্ত্রোপচারে ত্বকের এক ধরনের ক্যানসার সরানোর পর যেসব রোগীর ফেরার ঝুঁকি বেশি, তাঁদের জন্য ব্যক্তির টিউমার অনুযায়ী বানানো পরীক্ষামূলক এমআরএনএ চিকিৎসা গবেষণায় ভালো ফল দেখিয়েছে। প্রচলিত ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে এটি যোগ করলে ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর আপেক্ষিক ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমেছে বলে ২২ অক্টোবর প্রকাশিত ফল জানিয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, কিন্তু এখনো সবার জন্য অনুমোদিত সাধারণ ক্যানসার টিকা নয়।

মডার্না ও মার্কের সহযোগিতায় পরিচালিত তৃতীয় পর্যায়ের গবেষণায় এক হাজার ১৩৭ জন রোগী ছিলেন বলে ইউনিভার্সিটি অব সিডনির ২৩ অক্টোবরের বিবরণে জানানো হয়েছে। তাঁদের মেলানোমা অস্ত্রোপচারে সরানো হয়েছিল, তবে আবার রোগ হওয়ার ঝুঁকি ছিল। একটি দলের রোগীরা পেমব্রোলিজুমাব নামের প্রচলিত ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তুত এমআরএনএ চিকিৎসা পান; তুলনামূলক দলটি প্রচলিত চিকিৎসা পায়। দুই বছর পর রোগ না ফেরার হার ছিল যথাক্রমে ৮২ এবং ৭০ শতাংশ। এই দুটি পরিসংখ্যান একসঙ্গে পড়া দরকার। ৪২ শতাংশ হলো নির্দিষ্ট গবেষণার আপেক্ষিক ঝুঁকির পরিমাপ, আর ৮২ বনাম ৭০ হলো দুই বছরের পর্যবেক্ষণে দুটি দলের ফল।

চিকিৎসাটি কীভাবে ব্যক্তিগত? গবেষকেরা প্রতিটি রোগীর টিউমারে থাকা নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন খোঁজেন। সেই তথ্য দিয়ে এমন এমআরএনএ বার্তা তৈরি করা হয় যাতে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট ক্যানসার কোষ চিনতে পারে। তাই এক রোগীর জন্য তৈরি প্রস্তুতি আরেকজনের জন্য একই নয়। এই পদ্ধতি করোনাভাইরাসের টিকার সঙ্গে ব্যবহৃত এমআরএনএ প্রযুক্তির আত্মীয় হলেও কাজের উদ্দেশ্য আলাদা: এখানে অস্ত্রোপচারের পর অবশিষ্ট বা ফিরে আসা ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ জাগানোর চেষ্টা। টিউমার বিশ্লেষণ, প্রস্তুতকরণ এবং রোগীর কাছে পৌঁছানো—সব ধাপেই সময় ও দক্ষতা লাগে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা ফলকে আশাব্যঞ্জক বলেছেন। তবে ‘আশাব্যঞ্জক’ মানে সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া নয়। দীর্ঘ সময় পরে লাভ কতটা বজায় থাকে, জীবনকাল কতটা বাড়ে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী, বিভিন্ন রোগী গোষ্ঠীতে ফল একরকম কি না—এসব প্রশ্নে আরও বিশ্লেষণ দরকার। গবেষণাটি নির্দিষ্ট উচ্চঝুঁকির মেলানোমা রোগীদের নিয়ে; অন্য ক্যানসার বা শুরুতে ধরা রোগে একই ফল ধরে নেওয়া যাবে না। ওষুধটি অনুমোদন ও ব্যবহারযোগ্যতার আলাদা নিয়ন্ত্রক ধাপও পেরোতে হবে।

ফল প্রকাশের উৎস নিয়েও স্বচ্ছতা জরুরি। গবেষণায় জড়িত ওষুধ কোম্পানিগুলোই প্রাথমিক ফল ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে গবেষক ও চিকিৎসাকেন্দ্রের ব্যাখ্যা এসেছে, এবং বিস্তারিত তথ্য চিকিৎসাবিজ্ঞানী সমাজে যাচাইয়ের জন্য উপস্থাপিত হচ্ছে। কোম্পানির ফল অগ্রাহ্য করা যেমন ভুল, তেমনি স্বাধীন মূল্যায়ন শেষ হওয়ার আগেই ‘নিশ্চিত আরোগ্য’ বলা ভুল। চিকিৎসাবিষয়ক সংবাদে এই মাঝামাঝি অবস্থান খুব জরুরি। রোগী ও পরিবার যেন আশার খবর পান, কিন্তু অপ্রমাণিত নিশ্চয়তার ফাঁদে না পড়েন।

ব্যবহারিক সমস্যাও বড়। প্রত্যেক রোগীর টিউমার পরীক্ষা করে পৃথক চিকিৎসা তৈরি করতে হলে পরীক্ষাগার, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং চিকিৎসাকেন্দ্রকে দ্রুত সমন্বয় করতে হবে। খরচ কত হবে বা কোন দেশের রোগীরা প্রথমে পাবেন, এখনো পরিষ্কার নয়। উন্নত চিকিৎসা শুধু ধনী মানুষের নাগালে থাকলে বৈজ্ঞানিক সাফল্যের সামাজিক লাভ সীমিত হয়ে যায়। গবেষণার পরবর্তী অধ্যায় তাই শুধু অনুমোদনের নয়, প্রবেশাধিকার ও সমতারও।

বর্তমান তথ্য থেকে সবচেয়ে নির্ভুল কথাটি হলো: অস্ত্রোপচারের পর উচ্চঝুঁকির মেলানোমা রোগীদের একটি বড় গবেষণায় ব্যক্তিগত এমআরএনএ চিকিৎসা প্রচলিত ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে ভালো ফল দেখিয়েছে। এটি চিকিৎসার নতুন সম্ভাবনা খুলেছে। কিন্তু যে রোগী এখন চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাঁর জন্য সিদ্ধান্ত বদলানোর আগে নিজ চিকিৎসকের সঙ্গে নিজের রোগের স্তর, অনুমোদিত বিকল্প এবং গবেষণার সীমা আলোচনা করা প্রয়োজন। খবরের উত্তেজনার চেয়ে রোগীর নিরাপদ সিদ্ধান্ত বেশি মূল্যবান।

একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা এড়ানো উচিত: পরীক্ষামূলক ফল দেখে নিয়মিত ত্বক পরীক্ষা বা চিকিৎসকের পরামর্শ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না। গবেষণার রোগীরা আগেই নির্ণয় ও অস্ত্রোপচারের ধাপ পার করেছিলেন। নতুন চিকিৎসার সম্ভাবনা যতই উজ্জ্বল হোক, রোগ দ্রুত শনাক্ত করা এবং বর্তমান অনুমোদিত চিকিৎসা ঠিকমতো নেওয়ার গুরুত্ব থেকে যায়।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!