যুদ্ধের পক্ষে যখন ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করা হয়, তখন বিশ্বাসীদের ভূমিকা কী? ইতালির আসিসিতে বিভিন্ন ধর্মের নেতাদের শান্তি সম্মেলনে ২৭ অক্টোবর পাঠানো ভিডিও বার্তায় পোপ লিও চতুর্দশ সরাসরি এই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, ঈশ্বরের নামে যুদ্ধ চালানো যায় না; ‘পবিত্র যুদ্ধ’ বলে কিছু নেই, পবিত্র হলো শান্তি। শিরোনামের বাইরে বার্তাটির গুরুত্ব আরও বড়। ধর্মীয় পরিচয়কে সংঘাতের যুক্তি বানানোর প্রবণতার বিপরীতে তিনি সংলাপ, মধ্যস্থতা এবং সহিংসতা থেকে সরে আসার কথা বলেছেন।
পোপ নিজে সম্মেলনস্থলে যাননি। চিকিৎসকদের পরামর্শে সফর বাতিল করে ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন বলে পূর্বের প্রতিবেদনে জানানো হয়। আসিসির আয়োজনটি ১৯৮৬ সালের বিশ্ব শান্তি প্রার্থনা দিবসের চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে। সে সময় পোপ জন পল দ্বিতীয় বিভিন্ন ধর্মের নেতাদের একত্র করেছিলেন। এ বছরের আয়োজনের নাম ছিল ‘নিরস্ত্র ও নিরস্ত্রীকরণমুখী শান্তি’। পুরোনো ঘটনার স্মরণ হলেও নতুন বার্তাটি বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধ ও সহিংসতার ভাষা নিয়ে।
ভ্যাটিকান নিউজে প্রকাশিত বার্তায় লিও বলেছেন, ক্ষমতার সংস্কৃতি ও অস্ত্র জমার প্রবণতার মধ্যে ‘আসিসির চেতনা’ ফিরিয়ে আনা দরকার। তাঁর ব্যাখ্যায় এর অর্থ ধর্মের নামে যুদ্ধের যুক্তি প্রত্যাখ্যান, মধ্যস্থতা ও সংলাপ চালানো, এবং ভবিষ্যতের শান্তির জন্য বাস্তব কাজ করা। তিনি শুধু প্রার্থনার আহ্বান জানাননি; রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মানদণ্ড হিসেবেও শান্তিকে দেখার কথা বলেছেন। মানুষের কাছে কথাগুলো অনুপ্রেরণার হতে পারে, কিন্তু এগুলো কোনও রাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সমান নয়।
ধর্ম ও যুদ্ধের সম্পর্ক জটিল। বিভিন্ন পক্ষ কখনও নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে সমর্থন জড়ো করে, কখনও প্রতিপক্ষকে অমানবিকভাবে উপস্থাপন করে। কিন্তু কোনও যুদ্ধের কারণ সাধারণত শুধু ধর্ম নয়; ভূখণ্ড, ক্ষমতা, নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং ইতিহাসও জড়িত থাকে। পোপের বক্তব্যের অর্থ সব সংঘাতের একটিমাত্র ব্যাখ্যা পাওয়া নয়। বরং তিনি বলছেন, যে কারণেই সংঘাত শুরু হোক, ঈশ্বরের নাম ব্যবহার করে সহিংসতাকে পবিত্র বলে বৈধতা দেওয়া যায় না। এই নৈতিক সীমারেখাই বার্তার কেন্দ্র।
এপির প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, আসিসির অনুষ্ঠানে খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন শাখার পাশাপাশি মুসলিম ও বৌদ্ধ নেতারাও ছিলেন। তাই বক্তব্যটি শুধু ক্যাথলিকদের ভেতরের আলোচনা নয়। তবে অন্য ধর্মের প্রতিনিধিরা পোপের প্রতিটি ধর্মতাত্ত্বিক বক্তব্যের সঙ্গে একমত, এমন দাবি করা যাবে না। আন্তধর্মীয় মঞ্চের শক্তি হলো, ভিন্ন বিশ্বাস রেখে অন্তত মানুষের নিরাপত্তা ও সংলাপের জায়গায় একসঙ্গে কাজের পথ খোঁজা। মতের পার্থক্য মুছে ফেলা নয়, পার্থক্য নিয়েই শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়া এর বাস্তব পরীক্ষা।
সমালোচনার জায়গাও আছে। বড় ধর্মীয় নেতার শান্তির আহ্বান সংবাদ হয়, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য তা কতটা পরিবর্তন আনে? মধ্যস্থতার সুযোগ কোথায়, সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলো কথা বলতে রাজি কি না, এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সম্প্রদায়ের ভেতরে বিদ্বেষমূলক ভাষা থামাতে পারে কি না—এসব আরও কঠিন প্রশ্ন। শান্তির পক্ষে ঘোষণার মূল্য আছে; তবু তার পরের পদক্ষেপ ছাড়া প্রভাব বিচার করা যায় না। স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের কাজ, শরণার্থী সহায়তা এবং সহিংসতা রোধের উদ্যোগে সেই মূল্যায়ন দেখা সম্ভব।
বাংলাদেশের মতো বহু ধর্মের সমাজেও বার্তাটির অর্থ আছে। রাজনৈতিক বিরোধ বা আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ধর্মীয় সম্প্রদায়কে একসঙ্গে দোষারোপ করা সহজ, কিন্তু বিপজ্জনক। বিশ্বাসী মানুষের দায়িত্ব হতে পারে যাচাই ছাড়া উত্তেজক বার্তা না ছড়ানো, অন্যের নিরাপত্তাকে নিজের মতো গুরুত্ব দেওয়া এবং মতভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলার পথ খোলা রাখা। পোপের বক্তব্য কোনও স্থানীয় নীতির বিকল্প নয়; এটি ধর্মীয় ভাষার ব্যবহারে একটি নৈতিক সতর্কতা।
আসিসির চল্লিশ বছরের ইতিহাস দেখায়, একবারের প্রার্থনা দিয়ে যুদ্ধ থামে না। তবু নেতৃত্ব যখন স্পষ্ট করে বলে ধর্মের নামে হত্যা পবিত্র নয়, তখন জনআলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা টানা হয়। এখন দেখার বিষয়, সম্মেলনের পর নেতারা এই কথাকে বাস্তব সংলাপ ও সহায়তায় কতটা রূপ দিতে পারেন।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!