একটি শিশু স্বাভাবিকভাবে খেলছে, পড়ছে, কথা বলছে—তবু তার শরীরে ক্ষতিকর সীসার সংস্পর্শ থাকতে পারে। এ কারণেই সীসা বিষক্রিয়া নিয়ে জনস্বাস্থ্যবিদদের উদ্বেগ গভীর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৫ অক্টোবর নতুন করে দেশগুলোকে সীসার ঝুঁকি কমাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বছরে সাড়ে তিন মিলিয়নের বেশি মৃত্যুর পেছনে সীসার সংস্পর্শ ভূমিকা রাখে। এটি বৈশ্বিক রোগঝুঁকির পরিসংখ্যানগত অনুমান; নির্দিষ্ট বছরে সীসা পরীক্ষায় শনাক্ত মৃত্যুর সরাসরি গণনা নয়।
সীসা কোথা থেকে আসে? পুরোনো রং ও তার ধুলো, অনিরাপদ কিছু রান্নার পাত্র, প্রসাধনী, ভেজাল মসলা, শিল্পকারখানার দূষণ এবং নিয়ম না মেনে ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার—বিভিন্ন পথ রয়েছে। কোনো জায়গায় একটি উৎস বড়, অন্য জায়গায় আরেকটি। তাই শুধু একটি পণ্যকে দোষী ধরে গোটা সমস্যা বোঝা যায় না। ঝুঁকির উৎস জানতে স্থানীয় পরিবেশ, ব্যবহৃত পণ্য ও কাজের ধরন দেখতে হয়। ঘরে ব্যবহৃত কোনো জিনিস দেখতে পরিষ্কার হলেই তাতে ক্ষতিকর ধাতু নেই—এ নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।
শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকে, কারণ তাদের শরীর ও স্নায়ুতন্ত্র এখনও বিকশিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সীসার এমন কোনো সংস্পর্শমাত্রা জানা নেই যাকে নিশ্চিত নিরাপদ বলা যায়। কম মাত্রার সংস্পর্শও বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুরা মেঝেতে খেলে, হাত বা খেলনা মুখে দেয়; ধুলো থাকলে তা শরীরে যাওয়ার পথ তৈরি হয়। গর্ভাবস্থায় সংস্পর্শের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সীসাকে শুধু কারখানায় কর্মরত প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা ভাবলে শিশুদের ঝুঁকি আড়ালে থেকে যায়।
আরেকটি কঠিন দিক হলো লক্ষণ সব সময় স্পষ্ট হয় না। ক্লান্তি, মনোযোগের অসুবিধা বা পেটের সমস্যা থাকলেও শুধু সেগুলো দেখে সীসাকে কারণ বলা যায় না; আবার চোখে পড়ার মতো সমস্যা না থাকলেও সংস্পর্শ ঘটে থাকতে পারে। উপযুক্ত পরীক্ষা ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মূল্যায়ন ছাড়া ব্যক্তিগত রোগনির্ণয় সম্ভব নয়। কোনো শিশুর ঝুঁকির যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবায় যোগাযোগ করা উচিত। পরিবারের ওপর দায় চাপানোর চেয়ে উৎস চিহ্নিত করা ও পরিবেশ নিরাপদ করা অনেক বেশি কার্যকর।
সমস্যার সমাধানও তাই শুধু চিকিৎসাকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষতিকর রংয়ের নিয়ন্ত্রণ, পণ্যে সীসার পরীক্ষা, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের নিরাপদ নিয়ম—এসব জননীতি জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে অর্ধেকেরও কম দেশে সীসাযুক্ত রং নিয়ন্ত্রণে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছিল। এই তথ্য দেখায়, ঝুঁকিটি জানা থাকলেও প্রতিরোধের নিয়ম সর্বত্র সমান শক্ত নয়। আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ, নজরদারি এবং মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছানো সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নিম্ন আয়ের পরিবার কিংবা অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত মানুষের জন্য ঝুঁকি কমানো আরও কঠিন হতে পারে। পুরোনো বাড়ির রং নিরাপদভাবে সরানো, পরীক্ষিত পণ্য কেনা বা কর্মস্থলের নিয়ম বদলানোর ক্ষমতা সবার হাতে থাকে না। তাই জনস্বাস্থ্য উদ্যোগে এমন মানুষের অভিজ্ঞতা শুনতে হয়, যাঁরা ঝুঁকির উৎসের কাছেই বাস করেন বা কাজ করেন। শুধু সচেতনতা প্রচার দিয়ে শিল্পদূষণ থামানো যায় না। উৎপাদক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্বও একসঙ্গে দেখতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সীসার ক্ষতি মোকাবিলায় একটি বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা এবং ‘প্রিভেন্ট’ নামে কারিগরি সহায়তার প্যাকেজ ২০২৭ সালের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এগুলো এখনও ভবিষ্যতের উদ্যোগ; আজই পুরোপুরি চালু হয়ে গেছে—এমন নয়। পরিকল্পনা বাস্তব হলে দেশগুলো উৎস শনাক্ত, নিয়ম প্রণয়ন ও নজরদারিতে বেশি সহায়তা পেতে পারে। তবে সাফল্যের মাপকাঠি হবে বাস্তব পরিবর্তন: কোন পণ্য নিরাপদ হলো, দূষিত পরিবেশ পরিষ্কার হলো কি না, আর শিশুদের সংস্পর্শ কমল কি না।
সীসা বিষক্রিয়া নিয়ে সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটি হলো, ক্ষতি শুরু হওয়ার আগে অনেক সময় কোনো নাটকীয় সতর্কসংকেত আসে না। তাই অসুস্থতার অপেক্ষা না করে সম্ভাব্য উৎস খোঁজা এবং নিয়মের মাধ্যমে ঝুঁকি ঠেকানো দরকার। একটি শিশুর আচরণ দেখে নিশ্চিন্ত হওয়া যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি আতঙ্ক ছড়ানোও সমাধান নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন আহ্বান মনে করিয়ে দেয়, অদৃশ্য দূষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর লড়াই হয় আগেভাগে—পণ্য, কর্মস্থল ও বাসস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!