উৎসবের রঙে সাজছে...
অন্যান্য

ইসলাম শেখাতে ৬০-এর বেশি মুসলিমের কণ্ঠ: ব্রিটিশ শ্রেণিকক্ষের প্রশ্নটি কী?

ইসলাম শেখাতে ৬০-এর বেশি মুসলিমের কণ্ঠ: ব্রিটিশ শ্রেণিকক্ষের প্রশ্নটি কী?
লেখা বড়/ছোট করুন:

শিক্ষার্থীরা কোনো ধর্ম সম্পর্কে প্রথম ধারণা কোথা থেকে পায়? অনেকের জন্য উত্তর হবে স্কুলের পাঠ। সেই পাঠে যদি মানুষের বাস্তব জীবন, মতের ভিন্নতা ও প্রশ্ন করার সুযোগ কম থাকে, তবে ধর্মকে কয়েকটি স্থির নিয়মের তালিকা মনে হওয়া সহজ। যুক্তরাজ্যে ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মুসলিমস, আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইসলাম’ নামে নতুন শিক্ষাসামগ্রী ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন হয়েছে ১৯ অক্টোবর, ম্যানচেস্টারের ব্রিটিশ মুসলিম হেরিটেজ সেন্টারে। আয়োজকদের লক্ষ্য, ইসলাম সম্পর্কে পাঠদানকে আরও নির্ভুল ও আত্মবিশ্বাসী করা। কিন্তু একটি নতুন উপকরণ কি শ্রেণিকক্ষের পুরোনো ভুল ধারণা বদলাতে পারবে?

রিলিজিয়ন মিডিয়া সেন্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষাসামগ্রী তৈরিতে শিক্ষক, গবেষক এবং ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের ষাটের বেশি মুসলিমের অভিজ্ঞতা নেওয়া হয়েছে। ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের সহায়তায় শিক্ষার্থীদের উৎস ব্যাখ্যা করা, যুক্তিসংগত প্রশ্ন তোলা এবং মুসলিমদের বিভিন্ন জীবনচর্চা বোঝানোর উদ্দেশ্য রয়েছে। এই পদ্ধতির গুরুত্ব হলো, কোনো ধর্মের মানুষকে শুধু বাইরের বর্ণনায় সীমাবদ্ধ না রাখা। যাঁদের নিয়ে পাঠ, তাঁদের বক্তব্যও পাঠ তৈরির সময় শোনা হয়েছে—এটি শিক্ষার একটি মৌলিক নীতি।

তবে ‘মুসলিমদের কণ্ঠ’ বলা মানেই সব মুসলিম একরকম অভিজ্ঞতা জানান, এমন নয়। দেশ, ভাষা, পরিবার, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও ব্যক্তিগত চর্চায় বিস্তর পার্থক্য আছে। একজন শিক্ষার্থী যদি শুধু একটি মতকে সবার প্রতিনিধি ভেবে নেয়, তাহলে নতুন উপকরণও পুরোনো সরলীকরণই ফিরিয়ে আনবে। তাই বৈচিত্র্য দেখানোর পাশাপাশি কোন বক্তব্য কার, কোন প্রেক্ষাপটে বলা হচ্ছে, সেটি শেখানো জরুরি। ধর্মীয় শিক্ষা তখন মুখস্থ তথ্যের বাইরে গিয়ে মানুষকে বোঝার অনুশীলন হতে পারে।

আয়োজক সংস্থা আরই টুডে জানিয়েছে, ম্যানচেস্টারের উদ্বোধনী প্রশিক্ষণে শ্রেণিকক্ষে কর্মরত শিক্ষকেরা লেখকদের সঙ্গে কথা বলতে, প্রশ্ন করতে এবং একটি নমুনা পাঠ পরিকল্পনা দেখতে পারেন। কর্মসূচিটি তাঁদের বিষয়জ্ঞান বাড়ানো ও প্রচলিত ভুল ধারণা সামলানোর কৌশল তৈরির কথা বলছে। এই পরিচিতিমূলক সেশন বিনামূল্যে আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু বিনামূল্যের উদ্বোধনী প্রশিক্ষণকে পুরো কর্মসূচি বা সব শিক্ষাসামগ্রী স্থায়ীভাবে বিনামূল্যে পাওয়া যাবে বলে ধরে নেওয়া যাবে না; ভবিষ্যৎ ব্যবহারের শর্ত আলাদা।

কেন এমন উদ্যোগ দরকার হলো? যুক্তরাজ্যে ধর্মীয় শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিনের। রিলিজিয়ন মিডিয়া সেন্টার জানিয়েছে, আগের পরিদর্শন প্রতিবেদনে ইসলাম পাঠদানের কিছু ঘাটতি উঠে এসেছিল। শিক্ষকের আত্মবিশ্বাসও বড় বিষয়: ভুল বলার ভয় থাকলে পাঠ খুব সাধারণ হয়ে যেতে পারে, আবার আত্মবিশ্বাসের নামে একপাক্ষিক ব্যাখ্যাও চলে আসতে পারে। ভালো সহায়ক উপকরণ শিক্ষককে তথ্য যাচাই, উৎস তুলনা এবং কঠিন প্রশ্ন গ্রহণের পথ দিতে পারে। তবে সময় ও প্রশিক্ষণ ছাড়া বই বা ডিজিটাল ফাইল একাই সেই কাজ করবে না।

ধর্মীয় শিক্ষা আর ধর্মান্তরের প্রচেষ্টা এক বিষয় নয়। স্কুলে ইসলাম সম্পর্কে শেখানোর উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থী যেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বধর্ম ও তার অনুসারীদের সমাজজীবন সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক ধারণা পায়। বিশ্বাস গ্রহণ করা ব্যক্তির স্বাধীন সিদ্ধান্ত। এই সীমারেখা স্পষ্ট থাকলে ভিন্ন ধর্মের বা ধর্মহীন শিক্ষার্থীও নিরাপদে প্রশ্ন করতে পারে। একইভাবে মুসলিম শিক্ষার্থীকে নিজের পুরো সম্প্রদায়ের মুখপাত্র হতে বাধ্য করা উচিত নয়; একটি শ্রেণিকক্ষে তার পরিচয় বহু মাত্রার হতে পারে।

বাংলাভাষী পাঠকের জন্য খবরটির তাৎপর্য শুধু ব্রিটেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নানা দেশে ধর্ম নিয়ে অল্প তথ্য থেকে বড় সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়া এবং এক সম্প্রদায়কে এক ছবিতে আটকে ফেলার সমস্যা আছে। পাঠে মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসযোগ্য উৎস আনা এসব সমস্যার মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে কোনো দেশের পাঠ্যসামগ্রী হুবহু অন্য দেশে বসানো যায় না। স্থানীয় ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার্থীদের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে আলোচনা গড়তে হয়।

নতুন কর্মসূচির সাফল্য বোঝা যাবে ঘোষণার ভাষা দিয়ে নয়, শ্রেণিকক্ষে কী ঘটে তা দেখে। শিক্ষকরা কি ভিন্ন মুসলিম অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারছেন? শিক্ষার্থীরা কি উৎস যাচাই করে প্রশ্ন করছে? তারা কি কোনো বিশ্বাসের মানুষকে স্টেরিওটাইপে সীমাবদ্ধ না রেখে সহপাঠী হিসেবে দেখতে শিখছে? ষাটের বেশি কণ্ঠ নিয়ে শুরু হওয়া উদ্যোগটি সেই পরীক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, বাস্তব পাঠে কতগুলো কণ্ঠ সত্যি শোনা যায়—আর কতগুলো আবার বইয়ের পাতায় হারিয়ে যায়।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!