উৎসবের রঙে সাজছে...
অন্যান্য

ডিগ্রি আছে, কিন্তু শেখা কার? এআই যুগে তাসমানিয়ার নতুন ‘বিশ্বাসের সিল’ কীভাবে কাজ করবে

ডিগ্রি আছে, কিন্তু শেখা কার? এআই যুগে তাসমানিয়ার নতুন ‘বিশ্বাসের সিল’ কীভাবে কাজ করবে
লেখা বড়/ছোট করুন:

একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়েছেন, পরীক্ষায় পাসও করেছেন। কিন্তু নিয়োগদাতা জানতে চাইছেন: তিনি নিজে কতটা পারেন, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কতটা কাজ করেছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব তাসমানিয়া একটি নতুন মূল্যায়ন মান চালু করছে। সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী অ্যালান ফিঙ্কেলের প্রতিষ্ঠান প্রাউডলি হিউম্যানের সঙ্গে তৈরি ওই ব্যবস্থায় কোর্সের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা শিক্ষার্থী নিজে দেখাতে পারবেন কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। ২৭ অক্টোবর টাইমস হায়ার এডুকেশন এবং ২৮ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার এবিসি এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রস্তাবটির নাম ‘অ্যাসিউরড অ্যাসেসমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড’। বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখাতে হবে, প্রতিটি কোর্সে শেখার মূল লক্ষ্য কী এবং সেগুলো কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে। যেখানে শিক্ষার্থীর নিজের দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি, সেখানে পর্যবেক্ষণাধীন পরীক্ষা, শ্রেণিকক্ষে লেখা, মৌখিক ব্যাখ্যা বা সরাসরি কাজ দেখানোর মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ কেবল বাড়িতে বসে জমা দেওয়া একটি লেখার ওপর নির্ভর করে সব দক্ষতা প্রমাণ করা হবে না। তবে কোন বিষয়ে কোন মূল্যায়ন উপযুক্ত, সেই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়েরই থাকবে।

বাইরের নিরীক্ষার বিষয়টি উদ্যোগটির আলাদা বৈশিষ্ট্য। প্রাউডলি হিউম্যান কোর্সের নকশা, মূল্যায়নের নির্দেশনা এবং বাছাই করা নমুনা পরীক্ষা করতে পারে; শিক্ষক ও কিছু শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথাও বলতে পারে। এবিসির প্রতিবেদনে অ্যালান ফিঙ্কেল বলেছেন, বছরে এক বা দুইবার নিরীক্ষার পরিকল্পনা আছে। তিনি এই ব্যবস্থাকে আর্থিক হিসাবের নিরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করেছেন: প্রতিষ্ঠান নিজে কাজ করবে, বাইরে থেকে দেখা হবে ঘোষিত মান বাস্তবে অনুসরণ হচ্ছে কি না। তবে নিরীক্ষা কীভাবে চলবে এবং কতটা কার্যকর হবে, বাস্তব প্রয়োগ শুরু হওয়ার পরই তা বোঝা যাবে।

এখানে এআই পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, এমন ধারণা ভুল। টাইমস হায়ার এডুকেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু কাজের ক্ষেত্রে স্বীকৃতি দিয়ে এআই ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে। কিন্তু ডিগ্রি পেতে হলে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা যাচাইয়ের এমন অংশে পাস করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীর নিজের পারদর্শিতা দেখা যায়। এই দুই ধরনের মূল্যায়ন আলাদা রাখার চেষ্টা হচ্ছে। কারণ কর্মজীবনে এআই ব্যবহার করতে জানা দরকার হতে পারে, আবার এআই ছাড়া বিষয়টি বোঝা এবং নিজের সিদ্ধান্তের যুক্তি ব্যাখ্যা করতেও পারা দরকার।

উদ্যোগটির পক্ষে যুক্তি হলো ডিগ্রির অর্থ নিয়ে আস্থা ফেরানো। যদি নিয়োগদাতা মনে করেন সব লিখিত কাজ যন্ত্র করে দিয়েছে, তবে ভালোভাবে পড়া শিক্ষার্থীর অর্জনও সন্দেহের মুখে পড়ে। সরাসরি যাচাই সেই সন্দেহ কমাতে পারে। অন্যদিকে সমালোচনার প্রশ্নও আছে। বেশি পর্যবেক্ষণাধীন পরীক্ষার জন্য কক্ষ, শিক্ষক ও সময় লাগে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, দূরশিক্ষার্থী কিংবা চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা করা মানুষের উপযোগী ব্যবস্থা কী হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ‘মানবিকভাবে অর্জিত’ সিল যেন নতুন অসমতা তৈরি না করে, সে বিষয়ে নজর প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়টি নতুন ও পুনর্গঠিত কোর্সে এই মান প্রয়োগ শুরু করছে এবং মার্চের শেষ নাগাদ সব কোর্স এতে আনার লক্ষ্য জানিয়েছে বলে টাইমস হায়ার এডুকেশন লিখেছে। এটি পরিকল্পনা, ইতিমধ্যে সব ডিগ্রি যাচাই সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা নয়। এবিসি জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কোর্সে উপস্থিতি ও তত্ত্বাবধানের অধীনে মূল্যায়ন বাড়বে। কোন কোর্সে কতটা বদল হবে, তা প্রকাশিত পূর্ণ নির্দেশিকা ও পরবর্তী বাস্তবায়ন থেকে স্পষ্ট হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবর্তনের আগাম, পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাওয়া জরুরি।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও একই প্রশ্নের মুখে। কেবল এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যার দিয়ে শিক্ষার্থীর শেখা যাচাই করা কঠিন, কারণ এ ধরনের সফটওয়্যার ভুল সিদ্ধান্তও দিতে পারে। শ্রেণিকক্ষে আলোচনা, প্রকল্পের ধাপে ধাপে কাজ, মৌখিক পরীক্ষা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধান শিক্ষার্থীর নিজের চিন্তা দেখানোর সুযোগ দেয়। কিন্তু এক পদ্ধতি সব বিষয়ে সমান কার্যকর নয়। প্রকৌশল, সাংবাদিকতা, চিকিৎসা কিংবা সাহিত্য—প্রতিটির দক্ষতা যাচাইয়ের ধরন আলাদা হওয়া দরকার।

তাসমানিয়ার উদ্যোগ সফল হবে কি না, এখনই জানা যায় না। এটি একটি প্রতিশ্রুতিশীল পরীক্ষা, যার দাবি ও ফল আলাদা করে দেখতে হবে। কিছু মাস পর জানতে হবে, নিরীক্ষা শিক্ষার্থীর শেখা সত্যিই ভালোভাবে ধরতে পেরেছে কি না, শিক্ষকদের অতিরিক্ত চাপ কতটা এবং নিয়োগদাতারা এই সিলকে কতটা বিশ্বাস করছেন। ডিগ্রির কাগজের চেয়ে ডিগ্রির পেছনের শেখা যে বেশি মূল্যবান, নতুন বিতর্কটি সেই জায়গাতেই ফিরে গেছে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!