উৎসবের রঙে সাজছে...
আন্তর্জাতিক

৪০ বছর পর আবার আসিসিতে ধর্মীয় নেতারা: শান্তির আহ্বানের এবার পরীক্ষা কী?

৪০ বছর পর আবার আসিসিতে ধর্মীয় নেতারা: শান্তির আহ্বানের এবার পরীক্ষা কী?
লেখা বড়/ছোট করুন:

ইতালির আসিসি শহরে ১৯৮৬ সালের ২৭ অক্টোবর বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে শান্তির প্রার্থনার একটি ঐতিহাসিক আয়োজন হয়েছিল। চার দশক পরে একই শহরে আবার বড় আন্তধর্মীয় সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে। ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবরের অনুষ্ঠানে পোপ লিও চতুর্দশের অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে ভ্যাটিকান নিউজ। আয়োজকেরা বলছেন, ৫৩টি দেশের ধর্ম, সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠানের ৩৮৪ জন প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন। সংখ্যাগুলো নজর কাড়ে, কিন্তু বড় প্রশ্নটি অন্য: একই জায়গায় দাঁড়িয়ে শান্তির কথা বলার পর বাস্তবে মানুষ ও সমাজের জন্য কী বদলাবে?

১৯৮৬ সালে পোপ জন পল দ্বিতীয়ের আহ্বানে আসিসিতে নানা ধর্মের প্রতিনিধিরা শান্তির জন্য একত্র হয়েছিলেন। সেই স্মৃতি থেকে ‘স্পিরিট অব আসিসি’ নামে সংলাপের একটি ধারা গড়ে ওঠে। এবারের আয়োজনের পেছনে আছে ক্যাথলিক সংগঠন কমিউনিটি অব সানতেএজিদিও। তারা কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সংলাপের মঞ্চ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের আয়োজনের নাম ‘নিরস্ত্র ও নিরস্ত্রীকরণমুখী শান্তি’। নামটি প্রতীকী; এর সাফল্য মাপতে শুধু অনুষ্ঠানের ভাষা নয়, আলোচনার পরে সহযোগিতা কতটা এগোয়, সেটিও দেখতে হবে।

ভ্যাটিকান নিউজের বিবরণ অনুযায়ী, এবারে ১৫৫ জন বক্তা ২৪টি বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় অংশ নেবেন। শান্তি ও প্রার্থনার পাশাপাশি অর্থনীতি, শিশু ও তরুণ, গণমাধ্যম, অভিবাসন, নিরস্ত্রীকরণ এবং দারিদ্র্যের কথাও আলোচনায় থাকবে। এই বিস্তৃত তালিকা বোঝায়, ধর্মীয় সংলাপকে শুধু বিশ্বাসের মতপার্থক্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না আয়োজকেরা। মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তা, জীবিকা ও মর্যাদার প্রশ্নও সামনে আনতে চান। তবু আলোচনার বিষয় যত বেশি, নির্দিষ্ট কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করা তত কঠিন হতে পারে।

পোপ লিও চতুর্দশের অনুষ্ঠানের শেষ দিন, ২৭ অক্টোবর, আসিসিতে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। ভ্যাটিকানের তথ্য অনুযায়ী, তিনি নিচের বাসিলিকায় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে শান্তির জন্য প্রার্থনায় অংশ নেবেন; অর্থোডক্স খ্রিষ্টান নেতা প্যাট্রিয়ার্ক বারথোলোমিউও ধ্যান ও বক্তব্যের অংশে থাকবেন। পরে সেন্ট ফ্রান্সিসের বাসিলিকার বাইরের প্রাঙ্গণে পোপের শান্তির বার্তা দেওয়ার কথা। এটি এখনও ভবিষ্যতের কর্মসূচি। অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে বা পরিকল্পিত প্রত্যেকে এসে গেছেন—এমন দাবি এখন করা যাবে না।

একাধিক ধর্মের মানুষ এক মঞ্চে এলে একটি ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে: সবাই কি একসঙ্গে একইভাবে প্রার্থনা করবেন বা নিজেদের বিশ্বাস বদলাবেন? আয়োজকদের প্রকাশিত বিবরণে সংলাপ ও শান্তির যৌথ লক্ষ্য আছে, কিন্তু বিশ্বাসের পার্থক্য মুছে ফেলার কথা নেই। আসিসির ধারার গুরুত্ব বরং এখানেই যে, ভিন্ন ঐতিহ্যের মানুষ নিজেদের পরিচয় বজায় রেখে সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন। কথোপকথনের জন্য শতভাগ সহমত প্রয়োজন হয় না; পরস্পরের মর্যাদা স্বীকার করা এবং সাধারণ মানুষের ক্ষতি কমানোর ইচ্ছা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের পাঠকের কাছে এই আয়োজনের তাৎপর্য কোথায়? দূরের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান দেশের স্থানীয় সমস্যার সরাসরি সমাধান দিতে পারবে না। তবে এটি কিছু ব্যবহারিক প্রশ্ন সামনে আনে। উত্তেজনার সময় ভিন্ন বিশ্বাসের প্রতিবেশীর নিরাপত্তা নিয়ে আমরা কতটা ভাবি? গুজব ছড়ালে যাচাই করি কি? দারিদ্র্য বা দুর্যোগে সাহায্য করার সময় পরিচয় দেখি, নাকি প্রয়োজন দেখি? আন্তধর্মীয় সম্পর্কের গুণ মাপা যায় এমন দৈনন্দিন আচরণেও। বড় মঞ্চের ভাষণ স্থানীয় পর্যায়ে কাজের অনুপ্রেরণা দিতে পারে, কিন্তু সেই কাজ স্থানীয় মানুষকেই করতে হবে।

আসিসির অনুষ্ঠান যতই বড় হোক, একবারের সমাবেশে যুদ্ধ, ঘৃণা বা বৈষম্য থামবে না। তাই পরবর্তী প্রশ্ন হওয়া উচিত, অংশগ্রহণকারীরা কি নতুন সহযোগিতা শুরু করবেন, পুরোনো সম্পর্ক জোরদার করবেন এবং অসহায় মানুষের পাশে বাস্তবে দাঁড়াবেন? ১৯৮৬ সালের স্মৃতি অনুষ্ঠানের পরিচয় দেয়; ২০২৬ সালের ফল বিচার হবে তার পরের কাজে। ৪০ বছর ধরে বার্তাটি টিকে আছে। এবার দেখার বিষয়, বর্তমান সময়ের সংঘাত ও বিভাজনের মধ্যে সেই বার্তাকে কতটা কার্যকর উদ্যোগে রূপ দেওয়া যায়।

সম্মেলনের পরে একটি দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমেরও আছে। উদ্বোধনী ছবির বাইরে গিয়ে ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবে কত দূর এগোল, কারা অংশ নিলেন এবং কোন উদ্যোগে স্থানীয় মানুষের উপকার হলো, তা খোঁজা প্রয়োজন। একইভাবে আয়োজকদের বক্তব্যের সঙ্গে সমালোচনামূলক প্রশ্ন রাখাও সংলাপের বিরোধিতা নয়। বরং শান্তির দাবি কতটা বাস্তব, তা বোঝার উপায়। ভবিষ্যৎ কোনো যৌথ কাজের খবর না এলে এই আয়োজনকে সফল বলা কঠিন হবে; ফল এলে তা যাচাই করে জানানো যাবে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!