ইতালির পাহাড়ি শহর আসিসিতে বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিরা আবার শান্তির কথা বলতে জড়ো হয়েছেন। এমন ছবি আশাব্যঞ্জক, কিন্তু প্রশ্নও তীক্ষ্ণ: যুদ্ধ ও সহিংসতার মধ্যে এই বৈঠক শুধু সুন্দর ভাষণে শেষ হবে, নাকি মানুষের জীবনে কোনো কাজে লাগবে? ২৫ অক্টোবর শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনের উদ্বোধনী আলোচনায় এই প্রশ্নই তুলেছেন আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা হালা আলকারিব। ভ্যাটিকান নিউজকে তিনি বলেছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু অবস্থান জানালেই চলবে না; শান্তির জন্য বাস্তব পদক্ষেপে অংশ নিতে হবে। তাঁর বক্তব্য সম্মেলনের ঘোষিত লক্ষ্যকে একটি বাস্তব পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
‘অস্ত্রহীন ও নিরস্ত্রীকরণমুখী শান্তি’ শিরোনামের আয়োজনটি ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত হওয়ার কথা। আয়োজক সান্ত’এজিদিও সম্প্রদায়ের কর্মসূচি অনুযায়ী, প্রথম দিন উদ্বোধনী সভা, পরের দিনগুলোতে আলোচনাচক্র এবং শেষ দিনে বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী শান্তির প্রার্থনার আয়োজন রয়েছে। ভ্যাটিকান নিউজ জানিয়েছে, ২৫ অক্টোবর বিকেলে উদ্বোধন হয়েছে এবং পঞ্চাশের বেশি দেশের প্রতিনিধিরা শহরে জড়ো হয়েছেন। এটি কোনো সরকারপ্রধানদের বাধ্যতামূলক চুক্তি স্বাক্ষরের বৈঠক নয়; ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজ ও অন্য অংশগ্রহণকারীদের সংলাপের একটি মঞ্চ। তাই ফল বিচার করতে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি পরবর্তী কাজও দেখতে হবে।
আসিসির নাম এই ধরনের আলোচনায় নতুন নয়। ১৯৮৬ সালে পোপ জন পল দ্বিতীয় সেখানে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের শান্তির জন্য প্রার্থনায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। চলতি বছর সেই ঐতিহাসিক ঘটনার চল্লিশ বছর পূর্ণ হচ্ছে। সান্ত’এজিদিও বলছে, তখনকার উদ্যোগ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা নিয়মিত আন্তধর্মীয় সাক্ষাৎ আয়োজন করেছে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা অনুষ্ঠানের গুরুত্ব বাড়ায়, কিন্তু বর্তমান সংঘাতগুলোর সমাধান নিজে থেকে এনে দেয় না। চার দশক আগের স্মৃতি আজকের অংশগ্রহণকারীদের কাছে মূল্যবান হবে তখনই, যখন তা নতুন সহযোগিতার পথ খুলবে।
উদ্বোধনী সভায় হালা আলকারিব সুদানের সহিংসতা ও মানবিক দুর্দশার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর সংগঠন অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের কাজ করে। ভ্যাটিকান নিউজের সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সংঘাত শুধু একটি দেশের ভেতরে আটকে থাকে না; প্রতিবেশী অঞ্চলও এর প্রভাব পেতে পারে। তাঁর বক্তব্যে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা, ঘরবাড়ি হারানো এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উদ্বেগ এসেছে। এই সাক্ষাৎকারকে সুদানের সব ক্ষয়ক্ষতির স্বাধীন পূর্ণ হিসাব হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়; এটি মাঠপর্যায়ের একজন অধিকারকর্মীর দৃষ্টিভঙ্গি। তবু প্রশ্নটি বাস্তব: ধর্মীয় সম্প্রদায় সংকটে থাকা মানুষদের জন্য কী করতে পারে?
একটি সম্ভাব্য উত্তর হলো স্থানীয় বিশ্বাসের সম্পর্ক কাজে লাগানো। মসজিদ, গির্জা, মন্দির বা ধর্মীয় সংগঠন অনেক সমাজে মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। তারা নিরাপদ আশ্রয়, খাবার, শিক্ষা বা মানসিক সহায়তার উদ্যোগে অংশ নিতে পারে। কোথাও ধর্মীয় নেতারা উত্তেজনা কমাতে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারেন। তবে এই কাজের জন্য শুধু মঞ্চে একসঙ্গে ছবি তোলা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন শুনতে হবে, সহায়তার অর্থ কোথা থেকে আসবে তা স্পষ্ট করতে হবে এবং কাউকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বাদ দেওয়া যাবে না। আলকারিবের ‘কথা থেকে কাজে’ আহ্বানটির ব্যবহারিক অর্থ এখানেই।
সম্মেলনের থিমে ‘অস্ত্রহীন’ শব্দটি আছে, কিন্তু অংশগ্রহণকারীরা সবাই একই রাজনৈতিক অবস্থান বা সংঘাতের ব্যাখ্যায় একমত—এমন প্রমাণ নেই। আন্তধর্মীয় আলোচনার মূল্য বরং মতভেদ থাকা সত্ত্বেও সহযোগিতার জায়গা খোঁজায়। শান্তি নিয়ে কথা বলার সময় ভুক্তভোগীদের কণ্ঠ যেন আড়ালে না যায়, সেটিও জরুরি। নারী, বাস্তুচ্যুত পরিবার এবং ছোট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব কেবল নামের তালিকায় থাকলে চলবে না; আলোচনার সিদ্ধান্তে তাদের অভিজ্ঞতা জায়গা পেতে হবে।
২৬ অক্টোবর সম্মেলনের আলোচনা চলার কথা, তাই এখনই এর ফল ঘোষণা করা আগেভাগে হবে। পরবর্তী দিনে অংশগ্রহণকারীরা কি নির্দিষ্ট সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা বা ঘৃণা ও সহিংসতা কমানোর পথ জানাবেন—সেদিকেই নজর থাকবে। আসিসির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটাই: ধর্মের ভিন্নতা শান্তির কথোপকথনে বাধা হতে হবে না, কিন্তু কথোপকথনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে দৃশ্যমান কাজের প্রয়োজন।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!