আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য জায়গা আছে, অথচ বহু বিশ্ববিদ্যালয় সেই জায়গা পূরণ করতে পারছে না। অস্ট্রেলিয়ার উচ্চশিক্ষা খাতে এখন এমনই এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশটির শিক্ষা বিভাগের অক্টোবরের তথ্য নিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে বরাদ্দ পাওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর আসনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পূরণ করেছে। আশি শতাংশের বেশি আসন পূরণ করতে পেরেছে মাত্র পাঁচটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, এবং সেগুলো সবই বড় শহরে। বিশেষ চাপের মুখে আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। শুনতে এটি আবেদনকারীদের জন্য সুযোগের খবর মনে হতে পারে। কিন্তু আসন খালি থাকলেই ভর্তি বা ভিসা পাওয়া সহজ হয়ে যায় না।
আঞ্চলিক ক্যাম্পাসগুলোর অনেকটি সিডনি বা মেলবোর্নের মতো বড় শহরের বাইরে। সেখানে শিক্ষার্থী টানার কাজ আগে থেকেই প্রতিযোগিতামূলক। এখন ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা, আবেদন ব্যয় এবং অভিবাসন বিষয়ে উত্তপ্ত রাজনৈতিক আলোচনা তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নিউ সাউথ ওয়েলসের আঞ্চলিক এলাকায় ক্যাম্পাস থাকা চার্লস স্টার্ট ইউনিভার্সিটির একজন কর্মকর্তা দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান এ বছরের বরাদ্দের প্রায় চল্লিশ শতাংশ পূরণ করেছে। এটি পুরো দেশের সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা নয়, তবে আঞ্চলিক সংকট কতটা তীব্র হতে পারে, তার একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা সাধারণত স্থানীয় শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি ফি দেন। সেই আয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান, গবেষণা ও শিক্ষার্থীসেবার খরচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বিদেশি শিক্ষার্থী কমলে প্রভাব শুধু একটি ভর্তি দপ্তরে সীমিত থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে কোথায় ব্যয় কমাতে হবে, কী কী কোর্স চালু রাখা যাবে বা শিক্ষার্থীদের সহায়তা কতটা দেওয়া যাবে—এমন প্রশ্নও ওঠে। প্রতিবেদনে পশ্চিম সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেছেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমলে দেশীয় শিক্ষার্থীদের জন্য সেবা চালানোর বাজেটেও চাপ পড়ে। তবে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অবস্থা এক নয়; একই সংখ্যা দিয়ে সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি মাপা যায় না।
ভিসা এখানে বড় অনিশ্চয়তার জায়গা। আবেদন করলেই অনুমোদন মিলবে না, আবার প্রত্যাখ্যাত হলে সময় ও অর্থ—দুটিই হারানোর ঝুঁকি থাকে। প্রতিবেদনে এক বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে উচ্চ প্রত্যাখ্যানের হার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। এটি তাঁর প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও মন্তব্য; সব আবেদনকারীর ব্যক্তিগত সম্ভাবনার হিসাব নয়। কোনো দেশের শিক্ষার্থীর জন্য আজ কোন নিয়ম প্রযোজ্য, প্রয়োজনীয় নথি কী এবং খরচ কত—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ভিসা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের হালনাগাদ তথ্য দেখা জরুরি।
আরেকটি জটিলতা হলো, বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে দুই ধরনের দাবি একসঙ্গে শোনা যাচ্ছে। একদিকে আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরও শিক্ষার্থী চায় এবং স্থানীয় দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণের কথাও বলছে। অন্যদিকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষার্থী ভিসার অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর নিয়মের দাবি রয়েছে। ফেডারেশন ইউনিভার্সিটির কর্তৃপক্ষ আঞ্চলিক এলাকায় প্রয়োজনীয় পেশার কোর্সে পড়তে আগ্রহীদের জন্য বিশেষ ভিসার প্রস্তাব দিয়েছে বলে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে। প্রস্তাবটি বাস্তব নীতি হয়েছে—এমন নয়; এটি সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে আলোচনায় আছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জন্য খবরটির ব্যবহারিক অর্থ কী? প্রথমত, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন খালি থাকা মানে যোগ্যতার শর্ত কমে গেছে, এমন ধারণা করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, ভর্তি, বৃত্তি, কাজের সুযোগ ও ভিসা—প্রতিটি আলাদা প্রক্রিয়া। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক ক্যাম্পাস বেছে নেওয়ার আগে কোর্সের মান, পেশাগত স্বীকৃতি, মোট খরচ, থাকার ব্যবস্থা ও স্নাতক হওয়ার পরের নিয়ম যাচাই করা দরকার। প্রচারপত্রে একটি সংখ্যা আকর্ষণীয় দেখালেও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের জন্য পুরো হিসাব প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন যে দ্বিধায় আছে, তা সহজ ভাষায় এমন: শিক্ষার্থী দরকার, কিন্তু তাঁদের পৌঁছানোর পথ জটিল। আগামী মাসগুলোতে ভর্তি ও ভিসার প্রকৃত সংখ্যা দেখাবে সংকট কমছে কি না। সেই পর্যন্ত আবেদনকারীদের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ হলো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্য দেখা, সম্ভাব্য ব্যয় লিখে হিসাব করা এবং কোনো এজেন্টের নিশ্চয়তার বদলে সরকারি নিয়মকে ভিত্তি ধরা। খালি আসনের খবর কৌতূহল তৈরি করে; সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার পেছনের শর্তগুলোই বেশি জরুরি।
যাঁরা ইতিমধ্যে আবেদন করার কথা ভাবছেন, তাঁরা একই কোর্সের একাধিক প্রতিষ্ঠানের খরচ ও শর্ত পাশাপাশি লিখে তুলনা করতে পারেন। শুধু টিউশন ফি নয়, বাসস্থান, যাতায়াত, বিমা এবং সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ও ধরতে হবে। ভর্তি হওয়ার সুযোগ আর পড়াশোনা শেষ করার সামর্থ্য এক বিষয় নয়। শুরুতেই পুরো ছবিটি দেখা হলে উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম নয়, নিজের পরিস্থিতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!