একটি শিশুর জন্মের আগেই তার স্বাস্থ্যরক্ষার সুযোগ তৈরি করা যায়—বার্বাডোসের নতুন স্বীকৃতি সেই কথাই মনে করিয়ে দিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৩০ অক্টোবর জানিয়েছে, ক্যারিবীয় দেশটি মা থেকে শিশুর এইচআইভি সংক্রমণকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দূর করার আন্তর্জাতিক লক্ষ্য পূরণ করেছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে মা থেকে পাওয়া নতুন এইচআইভি সংক্রমণের ঘটনা রিপোর্ট হয়নি। খবরটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে ‘দূর’ শব্দটির অর্থ বুঝতে হবে: দেশ থেকে এইচআইভি পুরোপুরি চলে গেছে, এমন ঘোষণা নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি এসেছে স্বাধীন মূল্যায়নের পর। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ওই তিন বছরে বার্বাডোসে ৯৮ শতাংশ গর্ভবতী নারী গর্ভকালীন সেবা পেয়েছেন। একই অনুপাত এইচআইভি পরীক্ষা করেছেন। এইচআইভি নিয়ে বসবাসকারী গর্ভবতী নারীদের ৯৮ শতাংশ অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল চিকিৎসা পেয়েছেন। এই তিনটি সংখ্যা দেখায়, সফলতার পেছনে একটি ওষুধ বা একদিনের অভিযান নয়; নিয়মিত সেবা, পরীক্ষা এবং চিকিৎসার সমন্বয় কাজ করেছে। শিশুর জন্মের পরও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে দ্রুত পরীক্ষা ও অনুসরণ জরুরি।
মা থেকে শিশুর সংক্রমণ গর্ভাবস্থা, প্রসব বা স্তন্যপানের সময়ে ঘটতে পারে। সময়মতো এইচআইভি শনাক্ত করে উপযুক্ত চিকিৎসা চালিয়ে গেলে ঝুঁকি অনেক কমানো সম্ভব। তাই কাউকে পরীক্ষা করালেই কাজ শেষ হয় না। রিপোর্ট হাতে পাওয়া, চিকিৎসা শুরু, ওষুধ নিয়মিত পাওয়া, গোপনীয়তা রক্ষা এবং নবজাতকের পরীক্ষা—পুরো পথটি নিরাপদ হওয়া দরকার। বার্বাডোসের উদাহরণে এই ধারাবাহিক সেবাই প্রধান বিষয়। তবে কোনো ব্যক্তির চিকিৎসার সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শে নিতে হবে।
বার্বাডোসের সরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে গর্ভবতী নারীরা জাতীয়তা নির্বিশেষে বিনামূল্যে এইচআইভি পরীক্ষা ও চিকিৎসা পান বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে। পরীক্ষা স্বেচ্ছামূলক ও গোপনীয়। সংস্থার মূল্যায়নে এইচআইভি নিয়ে বসবাসকারী নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় জবরদস্তির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই তথ্যগুলো শুধু মানবাধিকারের প্রশ্ন নয়; মানুষ যদি অপমান, খরচ বা তথ্য ফাঁসের ভয় পান, তাহলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা থেকে দূরে থাকতে পারেন। সেবা পৌঁছানোর পথে বাধা কমানো জনস্বাস্থ্যের বাস্তব কৌশলও।
দেশটির কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে প্রায় ৯৩ শতাংশ জন্ম হয় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্পাদকীয় নোটে বলা হয়েছে। কেন্দ্রীভূত হাসপাতালভিত্তিক সেবার সঙ্গে সরকারি ক্লিনিক, নজরদারি ব্যবস্থা এবং নাগরিক সংগঠনের কাজ যুক্ত ছিল। এমন একটি কাঠামো গড়তে দীর্ঘ সময় ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ লাগে। ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা অন্য দেশে হুবহু কপি করা যাবে না; জনসংখ্যা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও দূরত্ব আলাদা। তবে গর্ভকালীন সেবার সঙ্গে এইচআইভি পরীক্ষা ও চিকিৎসা যুক্ত করার নীতি অন্য জায়গায়ও প্রাসঙ্গিক।
স্বীকৃতির ভাষা নিয়েও সতর্ক থাকা দরকার। ‘জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দূর’ বলতে আন্তর্জাতিক পরিমাপক পূরণ বোঝায়। ভবিষ্যতে নতুন সংক্রমণ আর কখনো ঘটবে না, এমন প্রতিশ্রুতি নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিজেই বলেছে, স্বীকৃতি ধরে রাখতে বার্বাডোসকে বিনিয়োগ, নতুন নির্দেশনা, তথ্যব্যবস্থা, এইচআইভি ও সিফিলিসের যৌথ পরীক্ষা এবং নারী ও শিশুর নিয়মিত অনুসরণ জোরদার করতে হবে। সাফল্যের পরে নজরদারি ঢিলে হলে অর্জন দুর্বল হতে পারে।
সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে ২৬টি দেশ ও অঞ্চল এইচআইভি, সিফিলিস বা হেপাটাইটিস বি-এর মা থেকে শিশুর সংক্রমণ দূর করার স্বীকৃতি পেয়েছে অথবা সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে আছে। এর মধ্যে আমেরিকা অঞ্চলে ১৫টি। তাই বার্বাডোসের স্বীকৃতিকে সব তিন রোগ দূর করার খবর হিসেবে পড়া ভুল। আজকের নির্দিষ্ট ঘোষণা এইচআইভি নিয়ে। আলাদা রোগের আলাদা পরীক্ষা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা আছে, যদিও মাতৃস্বাস্থ্য সেবায় সেগুলো একসঙ্গে দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য এ ঘটনা একটি প্রশ্ন তোলে: গর্ভকালীন সেবায় প্রত্যেক নারী কি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা সহজে, গোপনে এবং বিনা অপমানে পান? বার্বাডোসের ফলের সংখ্যাগুলো আশার কারণ, কিন্তু তার পেছনের ব্যবস্থা আরও বড় শিক্ষা। নিয়মিত পরীক্ষা, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা এবং অধিকারভিত্তিক সেবা মিললে সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙা যায়। আর সেই অর্জন ধরে রাখতে প্রতিদিন কাজ করে যেতে হয়।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!