উৎসবের রঙে সাজছে...
আন্তর্জাতিক

মন্দিরে হামলার আশঙ্কা কাটলেও ভয় কেন রয়ে গেল?

মন্দিরে হামলার আশঙ্কা কাটলেও ভয় কেন রয়ে গেল?
লেখা বড়/ছোট করুন:

 শিকাগোর হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্য লড়াই মন্দিরে উৎসবের প্রস্তুতি মানে পরিবারের সঙ্গে দেখা, প্রার্থনা আর আনন্দ। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো এলাকার একটি হিন্দু মন্দিরে সেই স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে গেছে একটি সম্ভাব্য হামলার ঘটনার পর। পুলিশ ও কৌঁসুলিদের অভিযোগ, অক্টোবরের শুরুতে এক তরুণ অরোরার শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী মন্দিরে গণহত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে কেউ আহত হননি। তবু ২৯ অক্টোবর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে সম্প্রদায়ের মানুষ বলেছেন, গ্রেপ্তার মানেই ভয় শেষ নয়। প্রশ্ন এখন কীভাবে নিরাপত্তা বজায় রেখে ধর্মীয় জীবন চালিয়ে যাওয়া যায়। কৌঁসুলিদের বিবরণ অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর আলেক্সান্দ্রোস পাপোরাকিস নামের ১৯ বছর বয়সী অভিযুক্ত মন্দিরের পার্কিং এলাকায় গিয়েছিলেন। তাঁরা দাবি করছেন, অস্ত্রের ত্রুটির কারণে তিনি গুলি চালাতে পারেননি এবং পরে সেখান থেকে চলে যান। তাঁর এক সহকর্মী সম্ভাব্য পরিকল্পনার কথা পুলিশকে জানান; পরে তাঁকে নিজ বাড়ির কাছাকাছি গ্রেপ্তার করা হয়। এসব তথ্য অভিযোগ ও তদন্তের অংশ। আদালতে বিচার শেষ হওয়ার আগে তাঁকে অপরাধী হিসেবে বর্ণনা করা উচিত নয়। মামলায় সন্ত্রাসী হুমকি ও বেআইনিভাবে অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে বলে সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ঘটনাটি নবরাত্রি উৎসবের সময় ঘটেছে বলে সম্প্রদায়ের উদ্বেগ আরও তীব্র। ধর্মীয় উৎসবে মানুষের ভিড় বাড়ে, শিশুসহ পরিবারের অনেক সদস্য একত্র হন এবং নিরাপদ পরিবেশের প্রত্যাশা থাকে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, উৎসবের আয়োজন বন্ধ করতে চান না; কিন্তু এখন অচেনা আচরণ, প্রবেশপথ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হচ্ছে। কারও কারও বাইরে বেরোতে দ্বিধা হচ্ছে। আবার অনেকে একসঙ্গে থাকার মধ্যেই সাহস খুঁজছেন। এই দুই প্রতিক্রিয়াই বাস্তব এবং পরস্পরবিরোধী নয়। ধর্মীয় স্থানে হামলার আশঙ্কা শুধু একটি ভবনের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। মন্দির স্থানীয় হিন্দুদের প্রার্থনার পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি, খাবার, সঙ্গীত ও পারিবারিক পরিচয়ের জায়গা হতে পারে। সেখানে ভয় তৈরি হলে মানুষের সামাজিক জীবনেও প্রভাব পড়ে। একটি শিশু যদি উৎসবে যেতে ভয় পায়, তা কেবল ওই দিনের অনুষ্ঠান হারানো নয়; নিজের সম্প্রদায়ের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কেও আঘাত। তাই নিরাপত্তা পরিকল্পনায় ধর্মীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ বজায় রাখা জরুরি। স্থানীয় দক্ষিণ এশীয় সংগঠনের প্রতিনিধি আশা রাও সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, অনেকে ক্ষুব্ধ ও হতবাক, কিন্তু তাঁরা ঐতিহ্য ধরে রাখতে চান। সম্প্রদায়ের এই অবস্থানকে কেবল ‘ভয় কাটিয়ে ওঠা’ বলে সহজ করা যায় না। নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা, পরিবারকে আশ্বস্ত করা, নতুন আসা মানুষকে জানানো এবং ঘৃণামূলক ভাষার জবাব দেওয়া—সব মিলিয়ে দীর্ঘ কাজ। কোনো গ্রেপ্তার সেই কাজের বিকল্প নয়। একই সঙ্গে আতঙ্কে উৎসব পরিত্যাগ করতে বাধ্য হওয়াও আক্রমণের উদ্দেশ্যকে পরোক্ষে সফল করতে পারে। এ ঘটনায় বিদ্বেষমূলক অপরাধের প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় ও কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা তদন্তকারীদের কাছে জানতে চাইছেন, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়কে লক্ষ্য করে পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না। কৌঁসুলিদের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত নিজেকে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী বলে পরিচয় দিয়েছেন এবং ভারতীয় ও অন্য সংখ্যালঘুদের বিষয়ে ঘৃণামূলক ভাষা ব্যবহার করেছেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট আইনি অভিযোগ প্রমাণের জন্য আদালতের মানদণ্ড আছে। জনসমক্ষে পাওয়া বক্তব্য তদন্তের গুরুত্ব বোঝায়, কিন্তু চূড়ান্ত রায় নয়। অনলাইনের বিদ্বেষ আর বাস্তব নিরাপত্তার সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে অপমানজনক ভাষা বেড়েছে বলে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন সতর্ক করেছে। তবে প্রতিটি অনলাইন বক্তব্য সরাসরি সহিংস ঘটনায় পরিণত হয় না, আর কোনো একটি ঘটনার কারণ নির্ধারণে তদন্ত প্রয়োজন। তা সত্ত্বেও বারবার অবমাননার পরিবেশে কোনো সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে পারে। বিদ্যালয়, কর্মস্থল এবং সামাজিক মাধ্যমের ভাষা তাই ধর্মীয় স্বাধীনতার আলোচনার বাইরে নয়। শিকাগো এলাকার হিন্দু সম্প্রদায় একরকম নয়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল, ভাষা ও ঐতিহ্যের মানুষ যেমন আছেন, তেমনি দক্ষিণ এশীয় বৃহত্তর পরিচয়ের অন্য সম্প্রদায়ের মানুষেরাও প্রতিবেশী। একজনের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ অন্যদেরও সতর্ক করে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের পারস্পরিক আস্থা গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহজনক আচরণ জানাতে মানুষের যেন ভয় না থাকে, আবার পরিচয়ের কারণে নিরীহ কাউকে সন্দেহভাজন করা না হয়—দুই দিকই বিবেচ্য। নিরাপত্তা জোরদার মানেই মন্দিরকে দুর্গ বানানো নয়। প্রবেশপথে দায়িত্বশীল স্বেচ্ছাসেবক, জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা, সন্দেহজনক তথ্য দ্রুত জানানো এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় সাহায্য করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট মন্দির কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা প্রকাশ্য সূত্রে নিশ্চিত না হলে অনুমান করা ঠিক নয়। যেকোনো পরিকল্পনা ধর্মীয় স্থানের খোলামেলা ও স্বাগত জানানোর চরিত্রও রক্ষা করা উচিত। নিরাপত্তা এবং উপাসনার স্বাধীনতা একই সঙ্গে বজায় রাখাই লক্ষ্য। এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় উত্তর সম্ভবত কোনো একক ব্যবস্থা নয়। বিচারপ্রক্রিয়া নিজের পথে চলবে; একই সময়ে মানুষের স্বাভাবিকভাবে মন্দিরে যাওয়ার অধিকার রক্ষা করতে হবে। সংবাদটি মনে করিয়ে দেয়, সহিংসতা ঠেকানো সফল হলেও ক্ষতির সম্ভাবনা যে ভয় তৈরি করে, তা অনেক দিন থেকে যেতে পারে। সেই ভয় কমে যখন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হয়, বিদ্বেষকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং সম্প্রদায়ের মানুষ উৎসবের আলো আবার নিজেদের মতো করে জ্বালাতে পারেন।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!