চীনের কারখানায় উৎপাদনের গতি নিয়ে নতুন সতর্ক সংকেত এসেছে। ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত সরকারি জরিপে অক্টোবরের উৎপাদন খাতের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স বা পিএমআই ৪৯ দশমিক ৩। সেপ্টেম্বরে ছিল ৫০ দশমিক ১। সাধারণভাবে ৫০-এর ওপরে সংখ্যা কার্যক্রমের বিস্তার আর নিচে সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়। ফলে শিরোনামে ‘কারখানা কমছে’ বলা সহজ, কিন্তু প্রশ্নটি আরও গভীর: বিশাল রপ্তানি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান এবং নতুন অর্ডারের ওপর চাপ কেন বাড়ছে?
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো ও সংশ্লিষ্ট শিল্প সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, বড় প্রতিষ্ঠানের পিএমআই অক্টোবরেও ৫০ দশমিক ২। অর্থাৎ ওই গোষ্ঠী অল্প ব্যবধানে বিস্তারের দিকে আছে। মাঝারি প্রতিষ্ঠানের সূচক ৪৮ দশমিক ৪, ছোট প্রতিষ্ঠানের ৪৭ দশমিক ৫। দুই গোষ্ঠীই সীমার নিচে এবং আগের মাসের তুলনায় নেমেছে। একই দেশের ভেতরে প্রতিষ্ঠানের আকার অনুযায়ী এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতীয় গড় দেখলে ছোট ব্যবসার অভিজ্ঞতা আড়ালে চলে যেতে পারে।
জরিপের উপসূচকগুলোও চাপের জায়গা দেখায়। উৎপাদন সূচক ৪৯ দশমিক ৮, নতুন অর্ডার ৪৯ দশমিক ৪। দুটিই ৫০-এর নিচে। কাঁচামালের মজুত ৪৮ দশমিক ৪ এবং কর্মসংস্থান ৪৮ দশমিক ৪। এই সংখ্যাগুলো সরাসরি কতটি কারখানা বন্ধ হয়েছে বা কত মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, তা বলে না। পিএমআই হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকের মাসিক প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে তৈরি বিস্তার সূচক; অর্থনীতির সম্পূর্ণ উৎপাদন পরিমাপ নয়। তবে ধারাবাহিক পরিবর্তনের আগাম আভাস দিতে এটি কাজে লাগে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে দেশীয় চাহিদার দুর্বলতা এবং রপ্তানির সাম্প্রতিক গতি নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশে পণ্য বিক্রি ভালো হলেও ঘরের বাজারের ক্রেতারা কম খরচ করলে মোট গতি ধরে রাখা কঠিন। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় দিবসের দীর্ঘ ছুটির পর কেনাকাটার গতি কমে যাওয়া এবং সেপ্টেম্বরে আগে আনা কিছু বিদেশি অর্ডারের প্রভাবও আলোচনায় আছে। এগুলো ব্যাখ্যা, জরিপ থেকে প্রমাণিত একমাত্র কারণ নয়। তথ্যের সঙ্গে সম্ভাব্য কারণ আলাদা রাখা জরুরি।
এক মাসের তথ্য দেখে মন্দা ঘোষণা করাও ভুল হবে। সরকারি সারণিতে মার্চ, এপ্রিল, জুন এবং সেপ্টেম্বরে উৎপাদন পিএমআই ৫০-এর ওপরে ছিল, জুলাই ও আগস্টে নিচে। অক্টোবরের ৪৯ দশমিক ৩ তাই বছরের ওঠানামার অংশও হতে পারে। আবার একই দিকে কয়েক মাসের দুর্বল অর্ডার ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেত। আগামী মাসের সংখ্যা, প্রকৃত শিল্প উৎপাদন, খুচরা বিক্রি এবং রপ্তানির তথ্য একসঙ্গে দেখলে অবস্থাটি পরিষ্কার হবে। বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের ভিত্তি এখানেই: একটি সূচক নয়, চাহিদার ধারাবাহিকতা।
কারখানার বাইরে পরিস্থিতিও মিশ্র। অক্টোবরে উৎপাদনবহির্ভূত খাতের কার্যক্রম সূচক ৪৯ দশমিক ৭, সেপ্টেম্বরে ৫০ দশমিক ২ ছিল। নির্মাণ খাতের সূচক ৪৮, আর সেবা খাত ঠিক ৫০। কিছু পরিবহন ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবায় উচ্চ গতি থাকলেও রিয়েল এস্টেটসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে সূচক নিচে। অর্থাৎ একটি বিস্তৃত অর্থনীতিতে সব খাত একই গতিতে চলছে না। জাতীয় গড়ের পেছনে এই বৈচিত্র্য বুঝলে ‘চীনের অর্থনীতি থেমে গেছে’ ধরনের অতিরঞ্জিত সিদ্ধান্ত এড়ানো যায়।
বাংলাদেশসহ চীনের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর জন্য এই খবরের গুরুত্ব আছে। চীন থেকে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল বা ভোক্তা পণ্য আনা প্রতিষ্ঠানের নজর থাকবে উৎপাদনের গতি, সরবরাহের সময় ও দামে। তবে অক্টোবরের পিএমআই থেকে বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের দাম বাড়বে বা কমবে—এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না। বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয়, স্থানীয় কর এবং চাহিদাও ফল নির্ধারণ করে। একটি জরিপকে সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি না বানিয়ে বাজারের বাস্তব দাম যাচাই করা ভালো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন চাহিদার। বড় কারখানা কিছুটা এগোলেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের নতুন কাজ কমে গেলে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মনোভাব প্রভাবিত হতে পারে। আবার নতুন নীতি, উৎসবের অর্ডার বা বিদেশি বাজারের পরিবর্তনে পরের মাসে সূচক ঘুরেও দাঁড়াতে পারে। অক্টোবরের রিপোর্ট নিশ্চিতভাবে যা বলছে, তা হলো উৎপাদন খাতের জরিপে গতি কমেছে এবং চাহিদা দুর্বল দেখাচ্ছে। কেন ও কত দিন—তার উত্তর পেতে পরের কয়েক দফা তথ্যের অপেক্ষা প্রয়োজন।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!