ধর্মীয় নেতা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কথা বলেন, আলোচনা কি শুধু নৈতিক উপদেশেই থামে? পোপ লিও চতুর্দশ ৩০ অক্টোবর ভ্যাটিকানে বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সঙ্গে আলোচনায় আরও বাস্তব একটি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, এআই উন্নয়নের নৈতিক নীতি অনেকটাই জানা; এখন সবচেয়ে জরুরি হলো এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যারা সেই নীতিগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারবে। এই বক্তব্যে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে প্রযুক্তি পরিচালনার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন এক জায়গায় এসেছে।
ভ্যাটিকানের প্রকাশিত বক্তৃতা অনুযায়ী, বৈঠকটির আয়োজন করেছে পন্টিফিকাল অ্যাকাডেমি ফর লাইফ এবং ফিউচার অব লাইফ ইনস্টিটিউট। আলোচনার বিষয় ছিল এআইয়ের ভবিষ্যৎ, উন্নয়ন ও প্রয়োগ। পোপ বলেন, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ আগে থেকে নির্ধারিত নয়; মানুষ যে সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরই তা নির্ভর করে। ফলে নতুন ব্যবস্থা বানানো সম্ভব বলেই সব প্রয়োগ গ্রহণ করতে হবে—এমন নয়। কোন কাজে এটি ব্যবহার হবে এবং কার উপকার হবে, সেই প্রশ্ন আগে তোলা দরকার।
বক্তৃতার দ্বিতীয় বড় বিষয়, যন্ত্রকে ব্যক্তি হিসেবে দেখার ঝুঁকি। পোপের বক্তব্যে এআইকে মানুষের তৈরি উপকরণ বলা হয়েছে। তাঁর যুক্তি, যন্ত্রের অভিজ্ঞতা, শরীর, সম্পর্ক বা মানবিক দায়বদ্ধতা মানুষের মতো নয়। তাই কোনো ক্ষতির জন্য জবাবদিহি করার দায়িত্ব প্রযুক্তির নামে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না। এআইকে আইনি ব্যক্তিত্ব দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক আছে; পোপ সেই প্রবণতার বিরুদ্ধে অবস্থান জানিয়েছেন। এটি ধর্মীয় দর্শনের ভাষায় বলা হলেও প্রশ্নটি ব্যবহারিক: ভুল সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কার কাছে প্রতিকার চাইবেন?
কিছু সিদ্ধান্ত কখনো যন্ত্রের হাতে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া উচিত নয় বলে তিনি সতর্ক করেন। উদাহরণ হিসেবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ বা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের তথ্যভান্ডারে কাউকে চিহ্নিত করার প্রসঙ্গ আনেন। জীবন, স্বাধীনতা এবং বলপ্রয়োগের মতো বিষয়ে কার্যকর ও দায়িত্বশীল মানবিক তদারকি চাইছেন তিনি। স্বয়ংক্রিয় প্রাণঘাতী অস্ত্র নিষিদ্ধ করার উদ্যোগে নভেম্বরে জেনেভায় বসা রাষ্ট্রগুলোকেও বাস্তব পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। বক্তৃতাটি নিজে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি নয়; এটি সরকারের জন্য নৈতিক ও রাজনৈতিক আবেদন।
পোপের মতে, প্রযুক্তির সুবিধা শুধু ক্ষমতাবান বা ধনী মানুষের হাতে জমা থাকলে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন ওঠে। চিকিৎসা, জ্ঞান এবং নতুন সুযোগে সবার অংশ থাকা উচিত। তাঁর বক্তব্যে ‘সাধারণ মঙ্গল’ ধারণাটি বারবার এসেছে—অর্থাৎ লাভের হিসাবের পাশাপাশি সমাজের দুর্বল মানুষের প্রভাবও বিবেচনা করা। এই ধারণার সঙ্গে ধর্মীয় সামাজিক শিক্ষার যোগ আছে। তবে বাস্তবে কোন নীতি দরিদ্র মানুষের সুযোগ বাড়াবে, তা পরিমাপ ও আলোচনা ছাড়া বোঝা যায় না।
সবচেয়ে জরুরি দাবিটি এসেছে বক্তব্যের শেষে। পোপ বলেছেন, নৈতিক নীতিগুলো লিখে রাখাই যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যৌথ মানদণ্ড, স্বাধীন তদারকি, স্পষ্ট জবাবদিহি এবং ক্ষতি হলে প্রতিকারের পথ দরকার। যে এআই ব্যবস্থা এক দেশে তৈরি হয়ে বহু দেশে ব্যবহৃত হয়, তার প্রভাব কোনো একটি রাষ্ট্রের নিয়মে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই আন্তর্দেশীয় সহযোগিতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কে সেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে, তার ক্ষমতা কতটুকু হবে এবং কোন দেশের নাগরিকের কথা কতটা শোনা হবে—এসব প্রশ্ন এখনো খোলা।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও পোপের এই অংশটিকে বক্তব্যের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছে। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্যাটিকানের নিজস্ব এআই কমিশন ও প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে আলোচনার সুযোগ ছিল এই বৈঠক। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভ্যাটিকান আইন তৈরি করতে পারে না, কিন্তু মানবিক মর্যাদা, অধিকার ও প্রযুক্তির সীমা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্কে প্রভাব রাখতে পারে। পোপের বক্তব্যকে তাই কোনো সফটওয়্যার নিষিদ্ধ করার ঘোষণা হিসেবে পড়া ঠিক হবে না।
বাংলাদেশের মতো দেশেও প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক। সরকারি সেবা, শিক্ষা বা চিকিৎসায় এআই ব্যবহার বাড়লে ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের পথ কার কাছে থাকবে? কোন তথ্য ব্যবহার হচ্ছে, কে পরীক্ষা করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কাকে জানাবেন—এগুলো আগে পরিষ্কার করা দরকার। ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে মানুষের মর্যাদা ও জবাবদিহির দাবি এখানে মিলিত হতে পারে। পোপের কথার সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিক তাই প্রযুক্তি নিয়ে ভয় নয়; নৈতিক প্রতিশ্রুতিকে কাজের নিয়মে রূপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জ।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!