উৎসবের রঙে সাজছে...
আন্তর্জাতিক

চীনের ৪০ প্রযুক্তি নিয়ে নতুন খসড়া: বিশ্ববাজারে কী বদলাতে পারে?

চীনের ৪০ প্রযুক্তি নিয়ে নতুন খসড়া: বিশ্ববাজারে কী বদলাতে পারে?
লেখা বড়/ছোট করুন:

একটি প্রযুক্তি শুধু দেশের ভেতর তৈরি হয় না; তার নকশা, উৎপাদনের কৌশল ও দক্ষতা সীমানা পেরিয়ে বহু প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। চীন এখন সেই প্রবাহের কিছু অংশে নতুন শর্ত বসানোর কথা ভাবছে। দেশটির বাণিজ্য ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয় প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণের তালিকা হালনাগাদের একটি খসড়া প্রকাশ করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিপ নকশা, সৌরশক্তি ও জীবপ্রযুক্তিসহ মোট ৪০টি প্রযুক্তির কথা আছে। এটি এখনও খসড়া; আজই সব প্রযুক্তির রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে—এমন দাবি করা ভুল হবে।

খসড়াটির সবচেয়ে আলোচিত অংশ AI। এপির হিসাবে ২৩ ধরনের AI প্রযুক্তি নতুন তালিকায় আছে, যার মধ্যে উন্নত বড় মডেল ও AI agent-সংক্রান্ত প্রযুক্তি রয়েছে। কিছু চিপ নকশার কৌশলও প্রস্তাবে এসেছে। পাশাপাশি সৌরশক্তি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রযুক্তি এবং জীবচিকিৎসার কয়েকটি ক্ষেত্রের কথাও বলা হয়েছে। প্রযুক্তির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ মানে সব সময় তৈরি পণ্য বিদেশে বিক্রি বন্ধ করা নয়। কোনো ক্ষেত্রে নকশা, কারিগরি জ্ঞান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া বা সফটওয়্যারের প্রবেশাধিকারই আসল বিষয় হতে পারে। তাই ‘সৌর প্যানেল বন্ধ’ বা ‘AI বন্ধ’ ধরনের সরল শিরোনাম প্রকৃত প্রস্তাবকে ভুলভাবে তুলে ধরতে পারে।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জাতীয় নিরাপত্তাকে এই উদ্যোগের একটি কারণ বলেছেন। প্রযুক্তি আজ অর্থনীতির পাশাপাশি নিরাপত্তা ও কূটনীতিরও বিষয়। উন্নত AI মডেল, দ্রুততর চিপ বা শক্তি উৎপাদনের কৌশল যে দেশে তৈরি হয়, অন্য দেশের প্রতিষ্ঠানও তা ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু রাষ্ট্রগুলো এখন কিছু প্রযুক্তি কতটা বাইরে যাবে, কার হাতে যাবে এবং কোন কাজে লাগবে, তা নিয়ে আগের চেয়ে বেশি সতর্ক। চীনের প্রস্তাব সেই বড় পরিবর্তনের একটি উদাহরণ, যদিও খসড়ার শেষ ভাষা ও প্রয়োগের নিয়ম এখনও জানা বাকি।

এই খবরের আরেকটি দিক হলো সময়। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র AI নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির ঘটনা সম্পর্কে যোগাযোগের পথ নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে বলে এপি জানিয়েছে। একই সময়ে প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেখায়, সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা পাশাপাশি চলতে পারে। একটি বিষয়ে আলোচনায় অগ্রগতি মানেই অন্য সব বিষয়ে অবাধ আদানপ্রদান শুরু হবে, এমন নয়। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য তাই শুধু বাজারের চাহিদা নয়, বিভিন্ন দেশের নিয়মও পরিকল্পনার অংশ হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ? সৌরশক্তির যন্ত্রপাতি, চিপ, সফটওয়্যার বা স্বাস্থ্যপ্রযুক্তির আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের ভূমিকা বড়। কোনো প্রযুক্তি অন্য দেশে নেওয়ার শর্ত বদলালে স্থানীয় কোম্পানির অংশীদার নির্বাচন, প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স বা ভবিষ্যৎ উৎপাদন পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে খসড়া প্রকাশের পরই বাংলাদেশে দাম বাড়বে বা কোনো প্রকল্প থেমে যাবে—এমন সিদ্ধান্তের প্রমাণ নেই। প্রভাব বোঝার জন্য চূড়ান্ত নিয়ম, কোন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অনুমতি লাগবে এবং সরবরাহকারীরা কীভাবে মানিয়ে নেবে, তা দেখতে হবে।

সৌরশক্তির উদাহরণটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একটি সৌর প্যানেল দোকানে পৌঁছানোর আগে কাঁচামাল, উৎপাদনের প্রযুক্তি, যন্ত্র ও পরিবহনের দীর্ঘ পথ পেরোয়। ওই পথের কোথাও নতুন শর্ত এলেই সব গ্রাহক সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। কেউ বিকল্প সরবরাহকারী পান, কেউ পান না। একইভাবে AI মডেলের ক্ষেত্রেও প্রকাশিত অ্যাপ, প্রযুক্তির মূল নকশা এবং গবেষণায় ব্যবহৃত দক্ষতা এক জিনিস নয়। কোন স্তরে নিয়ন্ত্রণ আসবে, তা না জেনে ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন সেবার ভবিষ্যৎ অনুমান করা যায় না।

প্রস্তাব নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন তিনটি। খসড়ার কোন অংশ শেষ পর্যন্ত আইনে বা প্রশাসনিক নিয়মে যাবে? রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার পদ্ধতি কতটা স্পষ্ট হবে? আর বিদেশি অংশীদার ও গবেষণাগারের কাজ এতে কীভাবে প্রভাবিত হবে? উত্তর পাওয়া যাবে সরকারি চূড়ান্ত নথি ও বাস্তব প্রয়োগে। এই মুহূর্তে নিশ্চিত খবর হলো, চীন প্রযুক্তি বিদেশে যাওয়ার নিয়ম নতুন করে ভাবছে। বিশ্ববাজারে তার প্রকৃত প্রভাব নিয়ে আগাম ভয় বা উচ্ছ্বাসের বদলে খসড়া আর কার্যকর নিয়মের পার্থক্যটি পরিষ্কার রাখা দরকার।

ব্যবসায়ী ও গবেষকদের জন্য পরের ধাপ হবে তালিকায় নির্দিষ্ট প্রযুক্তির সংজ্ঞা দেখা। একই নামের পণ্যের ভেতর ভিন্ন প্রক্রিয়া থাকতে পারে, আর নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় কেবল একটি বিশেষ কৌশলে প্রযোজ্য হয়। বিস্তারিত প্রকাশিত হলে সরবরাহ চুক্তি ও গবেষণা সহযোগিতার পরিকল্পনা নতুন করে মিলিয়ে দেখা সম্ভব হবে।

Sakir Mohammad

Sakir Mohammad

Graduate student in Journalism and Communication at Shanghai Jiao Tong University.

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!