উৎসবের রঙে সাজছে...
আন্তর্জাতিক

চীনের সৌরপ্যানেল রপ্তানিতে ব্রাজিলের সমান কার্বন সাশ্রয়? হিসাবের ভেতরে কী আছে

চীনের সৌরপ্যানেল রপ্তানিতে ব্রাজিলের সমান কার্বন সাশ্রয়? হিসাবের ভেতরে কী আছে
লেখা বড়/ছোট করুন:

চীনে তৈরি সৌরপ্যানেল, ব্যাটারি, বায়ুকল ও বৈদ্যুতিক গাড়ি বিশ্বের বহু দেশে যাচ্ছে। এই বাণিজ্য জলবায়ুর জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়ে ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণ নতুন সংখ্যা সামনে এনেছে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের গবেষক লাউরি মিলিভির্তা কার্বন ব্রিফে লিখেছেন, বর্তমান প্রবণতা বছরের শেষ পর্যন্ত চললে ২০২৬ সালে চীন থেকে রপ্তানি হওয়া পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বছরে প্রায় ৪৫ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন এড়ানো যেতে পারে। তুলনাটি ব্রাজিলের এক বছরের জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নির্গমনের কাছাকাছি। কিন্তু এটি ইতিমধ্যে মাপা সাশ্রয়ের পূর্ণ হিসাব নয়; বছরের শেষ অংশ নিয়ে অনুমান আছে।

গবেষক প্রথম তিন প্রান্তিকের রপ্তানি তথ্য, গন্তব্য দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কার্বন ঘনত্ব এবং চীনে সরঞ্জাম তৈরির সময় নির্গমন একত্র করেছেন। যুক্তি হলো, কোনো দেশে নতুন সৌরবিদ্যুৎ চালু হলে তা প্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অংশ সরিয়ে দিতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ি একইভাবে তেলচালিত গাড়ির কিছু ব্যবহার বদলায়। তবে বাস্তবে কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র কতটা কম চলবে কিংবা একটি গাড়ি কত দূর চলবে, তা অনুমানের বিষয়। তাই ‘এড়ানো নির্গমন’ সরাসরি বাতাস থেকে মাপা সংখ্যা নয়; তথ্য ও মডেলের ভিত্তিতে হিসাব।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রথম তিন প্রান্তিকে চীনের পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি রপ্তানির নির্গমন কমানোর সম্ভাব্য প্রভাব আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ভারী যানবাহনের চালান ৬১ শতাংশ, বায়ুকল ৪৫ শতাংশ, ব্যাটারি ৩৯ শতাংশ এবং সৌর সরঞ্জাম ২২ শতাংশ বেড়েছে। এসব বৃদ্ধি একসঙ্গে ঘটলেও প্রতিটি প্রযুক্তির জলবায়ু প্রভাব সমান নয়। কোন দেশে কী জ্বালানির বিকল্প তৈরি হচ্ছে, সেটি বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্লোবাল সাউথ। রপ্তানির অর্থমূল্যের বড় অংশ সমৃদ্ধ দেশে গেলেও সরঞ্জামগুলোর পুরো জীবনকালের সম্ভাব্য নির্গমন সাশ্রয়ের প্রায় ৭৬ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হবে বলে বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একাই এর বড় অংশের সঙ্গে যুক্ত। কারণ অনেক দেশে বিদ্যুতের উৎস এখনো বেশি কার্বননির্ভর, আর সূর্যালোকও প্রচুর। একই সৌরপ্যানেল ভিন্ন দেশে বসালে তার কার্বন সাশ্রয় তাই ভিন্ন হতে পারে।

বাংলাদেশের পাঠকের জন্য বিষয়টি সরাসরি প্রাসঙ্গিক। দেশে সৌরবিদ্যুৎ বা ব্যাটারি ব্যবহারের সম্ভাবনা আলোচনা করতে হলে শুধু প্যানেলের দাম নয়, গ্রিড সংযোগ, জমি, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুতের চাহিদা এবং পুরোনো উৎপাদন ব্যবস্থার বিকল্প কতটা তৈরি হচ্ছে—সব দেখতে হয়। চীনা প্রযুক্তির আমদানি সহজলভ্য হলেও প্রকল্প পরিকল্পনা দুর্বল হলে প্রত্যাশিত সুবিধা কমতে পারে। আবার উপযুক্ত স্থানে সঠিকভাবে স্থাপন ও ব্যবহারে নির্গমন কমার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তায় লাভ হতে পারে।

রপ্তানির পরিবেশগত হিসাব করতে উৎপাদনের নির্গমনও বাদ দেওয়া যায় না। সৌরপ্যানেল বা ব্যাটারি বানাতে বিদ্যুৎ, খনিজ ও পরিবহন লাগে। বিশ্লেষক সেই খরচ অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। ২০২৫ সালের পূর্ণ তথ্য দিয়ে তাঁর হিসাব, সরঞ্জাম তৈরি করতে চীনে প্রায় ১৭ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হলেও বিদেশে ব্যবহারের ফলে বছরে প্রায় ৩৭ কোটি টন নির্গমন এড়ানো সম্ভব। সমষ্টিগতভাবে উৎপাদনের কার্বন খরচ পুষিয়ে নিতে প্রায় ছয় মাস লাগতে পারে বলে তিনি অনুমান করেছেন। পণ্য ও গন্তব্যভেদে সময় আলাদা হবে।

আরেকটি সংখ্যা আরও বড়: ২০২৬ সালে রপ্তানি হওয়া সরঞ্জামগুলো যত দিন কাজ করবে, পুরো সময়জুড়ে সম্ভাব্য নির্গমন সাশ্রয় প্রায় ৮৪০ কোটি টন হতে পারে। এই হিসাবকে এক বছরের অর্জন বলা ভুল। একটি গাড়ি বা সৌরপ্যানেল বহু বছর চলে বলেই জীবনকালের অঙ্ক এত বড়। আবার যন্ত্রের স্থায়িত্ব, ব্যবহারের হার এবং ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বদলালে প্রকৃত ফলও পাল্টাবে। তাই তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি সংখ্যাকে আলাদা করে পড়তে হবে।

চীনের অর্থনীতির জন্য পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি এখন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে মোট রপ্তানির নিট বৃদ্ধির ১৬ শতাংশের পেছনে এই খাত ছিল। একই সঙ্গে দেশের ভেতরের বাজার অনেক প্রযুক্তির জন্য রপ্তানি বাজারের চেয়েও বড়। ফলে কেবল বিদেশে বিক্রির সাফল্য দিয়ে চীনের জ্বালানি রূপান্তর বোঝা যাবে না। দেশের নিজস্ব কয়লানির্ভর উৎপাদন, নবায়নযোগ্য শক্তি স্থাপন এবং শিল্পনীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে বাণিজ্য রাজনীতিও আছে। কিছু দেশ চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়াচ্ছে বা সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চায়। অন্যদিকে সস্তা পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি দ্রুত জলবায়ু পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে। দেশীয় শিল্প গড়ে তোলা, প্রতিযোগিতা বজায় রাখা এবং জরুরি নির্গমন হ্রাসের মধ্যে নীতিনির্ধারকদের ভারসাম্য খুঁজতে হবে। কোনো একটি সংখ্যাই এই দ্বন্দ্বের সমাধান নয়। বিশেষত শ্রম, উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিবেশগত প্রভাবও নজরে রাখতে হয়।

চীনের রপ্তানি সত্যিই কতটা কার্বন কমাবে, তা বুঝতে আগামী বছরের পূর্ণ রপ্তানি তথ্য এবং গন্তব্য দেশে সরঞ্জামের বাস্তব ব্যবহার দেখতে হবে। তবে বিশ্লেষণটি একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে: জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান কেবল আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ নয়, কারখানা থেকে বের হওয়া যন্ত্র কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও নির্ধারক। আজকের চমকপ্রদ তুলনার আসল মূল্য তাই সংখ্যার পেছনের শর্তগুলো বুঝতে পারায়।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!