উৎসবের রঙে সাজছে...
আন্তর্জাতিক

চীনের প্রবৃদ্ধি বাড়ল, তবু উদ্বেগ কেন? সংখ্যার আড়ালে অন্য গল্প

চীনের প্রবৃদ্ধি বাড়ল, তবু উদ্বেগ কেন? সংখ্যার আড়ালে অন্য গল্প
লেখা বড়/ছোট করুন:

চীনের অর্থনীতি আবার গতি পেয়েছে—শুধু একটি সংখ্যার দিকে তাকালে এমনই মনে হতে পারে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ তৃতীয় প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে হার ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রথম নয় মাসে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। আপাতদৃষ্টিতে এটি স্বস্তির খবর। কিন্তু রপ্তানি ভালো চললেও দেশের ভেতরের চাহিদা কতটা শক্তিশালী, সেই প্রশ্ন এখনো অর্থনীতির আলোচনার কেন্দ্রে।

জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর ১৯ অক্টোবরের প্রকাশনা এবং ২০ অক্টোবরের বিস্তারিত হিসাবে প্রান্তিকের সংখ্যাগুলো পাওয়া যায়। এগুলো প্রাথমিক হিসাব, পরে সংশোধিত হতে পারে। ব্যুরো জানিয়েছে, তৃতীয় প্রান্তিকে সেবা খাতের সংযোজিত মূল্য আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং দ্বিতীয় খাতের মূল্য ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সারণিতে নির্মাণ খাতে সংকোচনের ছবিও আছে। তাই মোট প্রবৃদ্ধির একটিমাত্র সংখ্যা দিয়ে প্রতিটি শিল্প, শহর বা পরিবারের অবস্থা বোঝা যায় না।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণে শক্তিশালী রপ্তানিকে সাম্প্রতিক গতি ফেরার বড় কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিদেশে চীনা পণ্যের ক্রেতা থাকলে কারখানা কাজ পায়, সরবরাহব্যবস্থা সচল থাকে এবং জাতীয় উৎপাদনের হিসাবে সহায়তা মেলে। কিন্তু বাইরের বাজারের ওপর ভরসা বাড়লে শুল্ক, বাণিজ্যবিরোধ বা অন্য দেশের সুরক্ষামূলক নীতির প্রভাবও বড় হয়। উৎপাদন যত দ্রুত বাড়ছে, দেশের নাগরিকেরা তত দ্রুত ব্যয় বাড়াচ্ছেন কি না—সেটি আলাদা প্রশ্ন। বিশ্লেষকেরা এখানেই দুর্বলতার ইঙ্গিত দেখছেন।

একটি উদাহরণে পার্থক্য বোঝা সহজ। কোনো কারখানা বেশি পণ্য বিদেশে বিক্রি করলেই আশপাশের সব পরিবার নতুন বাড়ি, গাড়ি বা সেবা কেনার নিশ্চয়তা পায় না। আয়, চাকরির নিরাপত্তা, ঋণের বোঝা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা মানুষকে ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। ফলে রপ্তানির সাফল্য আর স্থানীয় ভোগের শক্তি একই সূচক নয়। চীনের মতো বিশাল অর্থনীতিতে এই দুই গতির ফারাক নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্ববাজারের চাহিদা সব সময় নিজের হাতে থাকে না।

প্রকাশিত হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বার্ষিক তুলনায় প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ, পরের প্রান্তিকে ৪ দশমিক ৩ এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মানে তৃতীয় প্রান্তিকে আগের প্রান্তিকের তুলনায় বার্ষিক বৃদ্ধির হার একটু বেড়েছে; এটি পুরো বছরের প্রতিটি মাস সমান ভালো গেছে, এমন প্রমাণ নয়। সরকারি হিসাবে তৃতীয় প্রান্তিকে আগের প্রান্তিকের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। বার্ষিক ও প্রান্তিক তুলনা আলাদা পদ্ধতি, তাই দুটিকে বিনিময়যোগ্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।

চীন চলতি বছরের জন্য ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রেখেছে। নতুন হিসাব সেই পরিসরের নিচের সীমার কাছাকাছি। লক্ষ্য পূরণের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ আছে, তবে বাকি মাসের তথ্য না দেখে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা যায় না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস এবং অন্য বিশ্লেষকের মূল্যায়নও সরকারি তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়। কোনো পূর্বাভাস ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নয়; বাস্তব সংখ্যা প্রকাশের পরেই তার বিচার সম্ভব।

বাংলাদেশের মতো দেশে এই খবরের প্রভাব সরাসরি ও পরোক্ষ দুইভাবেই আসতে পারে। চীন বড় উৎপাদক ও বাণিজ্য অংশীদার; তার কারখানার চাহিদা, জাহাজ চলাচল এবং বাজারের পরিবর্তন আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। তবে একটি প্রান্তিকের প্রবৃদ্ধি দেখে বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের দাম বা রপ্তানি আয় নিশ্চিতভাবে বাড়বে বলে বলা যায় না। সেই সিদ্ধান্তের জন্য পণ্যভিত্তিক বাণিজ্য তথ্য, চাহিদা এবং নীতির পরিবর্তন একসঙ্গে দেখতে হবে।

সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন তাই ৪ দশমিক ৫ শতাংশের অঙ্কটি নয়, এর ভেতরের ভারসাম্য। বিদেশি ক্রেতা চীনের উৎপাদন টেনে তুলছে—দেশের ভেতরের ক্রেতারাও কি একই আত্মবিশ্বাসে ফিরছেন? পরের কয়েক মাসের খুচরা বিক্রি, কর্মসংস্থান, আবাসন এবং রপ্তানির তথ্য এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট করবে। গতি ফিরেছে বলা যায়, কিন্তু ভিত কতটা মজবুত, সেটি এখনো খতিয়ে দেখার বিষয়।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!