চীনের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বছরের প্রথম নয় মাসের মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। ২৭ অক্টোবর দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো এই হিসাব প্রকাশ করেছে। সেপ্টেম্বর মাসে আলাদাভাবে মুনাফা বেড়েছে ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রথম দেখায় এটি শিল্প খাতের শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের ছবি। কিন্তু একই নথির ভেতরে আরেকটি গল্প আছে: ইলেকট্রনিকস ও কিছু উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প দ্রুত এগোলেও গাড়ি, নির্মাণসামগ্রী ও কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী খাতে মুনাফা কমেছে। ফলে একটি সামগ্রিক হার দিয়ে পুরো চীনা শিল্পের অবস্থা বোঝা যায় না।
পরিসংখ্যানের সীমানা আগে পরিষ্কার করা জরুরি। এখানে ‘বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান’ বলতে বছরে অন্তত দুই কোটি ইউয়ান প্রধান ব্যবসায়িক আয় করা প্রতিষ্ঠান বোঝানো হয়েছে। ক্ষুদ্র কারখানা, সব ধরনের সেবা প্রতিষ্ঠান বা দেশের প্রতিটি ব্যবসা এই হিসাবে নেই। আবার মুনাফা বৃদ্ধির ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ মানে সব প্রতিষ্ঠানের আয় একই হারে বেড়েছে, সেটিও নয়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে তাদের মোট ব্যবসায়িক আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। বিক্রি এবং লাভের বৃদ্ধির হার আলাদা; খরচ ও পণ্যের দামের পরিবর্তনও ফলকে প্রভাবিত করে।
সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো পার্থক্য ইলেকট্রনিকসে। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর খাতভিত্তিক হিসাবে, কম্পিউটার, যোগাযোগযন্ত্র ও অন্য ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উৎপাদনের মুনাফা বেড়েছে ১০৩ দশমিক ৮ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআইয়ের জন্য কম্পিউটিং ক্ষমতা ও উন্নত মেমোরি প্রযুক্তির চাহিদা কিছু উপখাতকে দ্রুত এগিয়ে নিয়েছে। উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদনের মুনাফা ৫২ শতাংশ বেড়েছে বলেও তারা জানিয়েছে। এই সংখ্যা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখায়, কিন্তু বড় বৃদ্ধির পেছনে আগের বছরের ভিত্তি কত কম ছিল, সেটিও বুঝতে হয়।
অন্য ছবিটি কম উজ্জ্বল। গাড়ি উৎপাদনে মুনাফা কমেছে ২২ দশমিক ৮ শতাংশ। ধাতব নির্মাণসামগ্রীর একটি বড় খাতে পতন ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ, আর অধাতব খনিজপণ্য খাতে ৪৬ দশমিক ৯ শতাংশ। বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদন সরবরাহের মুনাফাও কমেছে। এমন বৈপরীত্য থেকে বোঝা যায়, প্রযুক্তিনির্ভর রপ্তানি ও নতুন যন্ত্রপাতির চাহিদা সব কারখানাকে সমানভাবে টানছে না। যে খাত অভ্যন্তরীণ নির্মাণ বা ভিন্ন ধরনের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল, তাদের সমস্যার চরিত্র অন্য রকম হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানের মালিকানার ধরনেও ফারাক আছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বেড়েছে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেড়েছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। বিদেশি এবং হংকং, ম্যাকাও ও তাইওয়ানের বিনিয়োগযুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। তবে এসব শ্রেণির মধ্যে কিছু হিসাবের ওভারল্যাপ আছে বলে পরিসংখ্যান ব্যুরো নিজেই জানিয়েছে। তাই আলাদা শ্রেণির সংখ্যা যোগ করে সামগ্রিক মুনাফা বের করা যাবে না। একই কারণে এক শ্রেণির কম বৃদ্ধি দেখে তার প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত টানা ঠিক নয়।
রয়টার্স এই পরিস্থিতিকে দুই গতির অর্থনীতির ছবি হিসেবে তুলে ধরেছে। উচ্চপ্রযুক্তির কিছু অংশ বাড়ছে, কিন্তু বিস্তৃত শিল্পভিত্তির সব অংশ একই সুবিধা পাচ্ছে না। এই বিশ্লেষণ সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও ভবিষ্যৎ পথ নির্দিষ্ট করে না। পরবর্তী মাসগুলোতে নতুন অর্ডার, পণ্যের দাম, ভোক্তা চাহিদা এবং রপ্তানির অবস্থার ওপর মুনাফা নির্ভর করবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতি বা কাঁচামালের খরচ বদলালে হিসাব দ্রুত পাল্টাতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই তথ্য কেবল দূরের অর্থনৈতিক খবর নয়। বাংলাদেশ চীন থেকে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানি করে। চীনের সরবরাহব্যবস্থায় প্রযুক্তিখাতের জোর বা কিছু শিল্পের দুর্বলতা পণ্যের মূল্য ও সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু নয় মাসের মুনাফার তথ্য থেকে নির্দিষ্ট বাংলাদেশি পণ্যের দাম বাড়বে বা কমবে বলে এখনই সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। আমদানিকারকদের জন্য বেশি জরুরি হলো খাতভিত্তিক প্রবণতা, চুক্তির দাম এবং সরবরাহের সময়সীমা একসঙ্গে দেখা।
এই সংখ্যার আসল কৌতূহল এখানেই: ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ সামগ্রিক বৃদ্ধি যতটা শক্তিশালী শোনায়, তার নিচে শিল্পভেদে ব্যবধান ততটাই বড়। পরবর্তী তথ্য দেখাবে, ইলেকট্রনিকসের মুনাফা বৃদ্ধি অন্য খাতে ছড়ায় কি না, নাকি চীনের কারখানাগুলো আরও স্পষ্টভাবে দুই গতিতে চলতে থাকে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!