উৎসবের রঙে সাজছে...
আন্তর্জাতিক

কঙ্গোতে ইবোলার আক্রান্ত ১০ হাজার ছাড়াল: এত দ্রুত ছড়ানোর পেছনে কী বাধা?

কঙ্গোতে ইবোলার আক্রান্ত ১০ হাজার ছাড়াল: এত দ্রুত ছড়ানোর পেছনে কী বাধা?
লেখা বড়/ছোট করুন:

আফ্রিকার গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে চলমান ইবোলা প্রাদুর্ভাবে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত সরকারি হিসাব উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, ১০ হাজার ৬০ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা ৪ হাজার ৮৮৭। এপিও একই দিনে ১০ হাজারের সীমা পেরোনোর খবর দিয়েছে। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এত মানুষের চিকিৎসা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খোঁজ এবং নিরাপদ সৎকারের কাজে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বিরাট চাপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যাকে পুরো আফ্রিকায় একই মাত্রার সংক্রমণের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চলতি প্রাদুর্ভাবকে বান্দিবুগিও ভাইরাসজনিত ইবোলা রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইবোলা রোগ শরীরের তরল পদার্থের মাধ্যমে ছড়ায়, বিশেষ করে অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে বা সুরক্ষাবিহীন পরিচর্যায় ঝুঁকি বাড়ে। সাধারণ সর্দিকাশির মতো দূর থেকে বাতাসে সহজে ছড়িয়ে পড়ে, এমন ধারণা ঠিক নয়। শুরুর উপসর্গ অন্য অনেক রোগের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। তাই কেবল জ্বর দেখেই ইবোলা নিশ্চিত করা যায় না; পরীক্ষাগার, রোগীর ইতিহাস এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মূল্যায়ন প্রয়োজন।

কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হচ্ছে? এপির মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যকর্মীদের যাতায়াতের গাড়ি থেকে শুরু করে সুরক্ষা সামগ্রীর প্রয়োজনের কথা এসেছে। কিছু এলাকায় মানুষের অবিশ্বাসের কারণে অসুস্থ ব্যক্তি বা মৃতের দেহ নিরাপদ ব্যবস্থায় আনাও কঠিন হয়ে পড়ছে। আগের দিন একটি ইবোলা সতর্কবার্তায় সাড়া দিতে গিয়ে একজন নার্স নিহত এবং আরেক স্বাস্থ্যকর্মী গুরুতর আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। সহিংসতা ও অবিশ্বাস থাকলে সংস্পর্শ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং টিকাদান—সব কাজই পিছিয়ে যায়। রোগ নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসা যত জরুরি, মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগও তত জরুরি।

সংখ্যার আরেকটি কঠিন দিক হলো মৃত্যুহার। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাব পাশাপাশি রাখলে প্রায় অর্ধেকের মতো অনুপাত দেখা যায়। কিন্তু এটিকে প্রত্যেক নতুন রোগীর মৃত্যুর নির্দিষ্ট সম্ভাবনা বলা যাবে না। কিছু রোগী এখনও চিকিৎসাধীন; আবার সব সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি, এমন সম্ভাবনাও থাকে। পরিসংখ্যান সময়ের সঙ্গে বদলায়। তাই কেসসংখ্যা, মৃত্যু এবং চিকিৎসাধীন মানুষের অবস্থা আলাদা করে পড়া দরকার। শুধু ভয় তৈরি করার মতো অঙ্ক ছড়ালে মানুষ চিকিৎসাকেন্দ্র এড়িয়ে যেতে পারেন, যা উল্টো ক্ষতি করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায় ইবোলা নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি কাজ একসঙ্গে করার কথা বলা হয়: দ্রুত রোগ শনাক্ত, নিরাপদ চিকিৎসা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সৎকার এবং জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ। টিকা থাকলেও তা একক সমাধান নয়। চলতি ভাইরাসের ধরন অনুযায়ী কোন টিকার কার্যকারিতা বা ব্যবহার উপযুক্ত, তা বিশেষজ্ঞ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তের বিষয়। কোনও সংবাদে টিকা দেওয়ার ছবি দেখে সব মানুষ একই সুরক্ষা পেয়েছেন বলে ধরে নেওয়া ভুল।

সীমান্তের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কঙ্গোর প্রতিবেশী দেশগুলো মানুষের চলাচল, রোগ শনাক্ত এবং সংস্পর্শ পর্যবেক্ষণে সতর্ক আছে। একটি দেশে বড় প্রাদুর্ভাব মানে পাশের দেশে একই সংখ্যার রোগী আছে, এমন নয়। তবে মানুষ কাজ, ব্যবসা বা পরিবারের কারণে যাতায়াত করেন; তাই তথ্য আদানপ্রদান দ্রুত হওয়া প্রয়োজন। সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে মানুষ যেন শাস্তি বা অপমানের ভয় ছাড়া চিকিৎসা নিতে পারেন, সেটিও রোগ নিয়ন্ত্রণের অংশ। আতঙ্ক ও গুজব বাস্তব স্বাস্থ্যঝুঁকিকে আড়াল করে।

বাংলাদেশের পাঠকের জন্য সরাসরি বার্তা হলো, কঙ্গোর খবর দেখে স্থানীয় সংক্রমণ হয়েছে ধরে নেওয়ার কারণ নেই। বিদেশ ভ্রমণ শেষে জ্বর বা অন্য গুরুতর উপসর্গ হলে ভ্রমণের ইতিহাস চিকিৎসককে জানানো উচিত। দূরদেশের ছবি বা পুরোনো ভিডিওকে আজকের প্রাদুর্ভাব বলে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা দরকার। নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারি আপডেট দেখাই নিরাপদ। ব্যক্তিগত চিকিৎসা বা টিকা নিয়ে সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নেওয়া ঠিক হবে না।

দশ হাজারের সীমা পেরোনো প্রাদুর্ভাবের গতি বুঝিয়ে দিচ্ছে, কেবল ওষুধের কথা বললেই চলবে না। আক্রান্তকে দ্রুত খুঁজে পাওয়া, কর্মীদের সুরক্ষা, স্থানীয় মানুষের আস্থা এবং সীমান্তপারের সহযোগিতাই এখন নির্ণায়ক। আগামী দিনের দৈনিক তথ্য বলবে, নতুন সংক্রমণ কমার দিকে যাচ্ছে কি না।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!