উচ্চশিক্ষার খবর বলতে আমরা প্রায়ই ভর্তি কমে যাওয়া, খরচ বেড়ে যাওয়া বা অনলাইন পড়ার বিতর্ক শুনি। যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের একটি নতুন পরিসংখ্যান অন্য রকম ছবি দেখাচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইয়ের দশটি ক্যাম্পাস মিলিয়ে ২০২৬ সালের শরৎ সেমিস্টারে শিক্ষার্থী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৬১৭। টানা তৃতীয় বছর সংখ্যাটি ৫০ হাজারের ওপরে। কিন্তু শুধু মোট ভর্তি দেখলে পরিবর্তনের সবচেয়ে কৌতূহলজনক অংশটি চোখ এড়াতে পারে: বিশ্ববিদ্যালয়টির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী অন্তত একটি অনলাইন কোর্স নিচ্ছেন। অর্থাৎ ক্যাম্পাসের সঙ্গে ডিজিটাল পাঠও এখন অনেক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতার অংশ।
২২ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের শরৎ সেমিস্টারে মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ৪৮ হাজার ৩৭৩ জন। চার বছরে বৃদ্ধি প্রায় পাঁচ শতাংশ। এত বড় ব্যবস্থায় এই বৃদ্ধির অর্থ হলো আরও মানুষ পড়াশোনার পথে এসেছেন বা ফিরে এসেছেন। তবে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক প্রবণতা বলা যায় না। এটি হাওয়াইয়ের একটি দশ-ক্যাম্পাস ব্যবস্থার তথ্য। অন্য রাজ্যে জনসংখ্যা, খরচ, চাকরির বাজার ও শিক্ষানীতি ভিন্ন হতে পারে। ভালো সংবাদ বিশ্লেষণে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাফল্যকে পুরো দেশের চিত্র বানানো ঠিক নয়।
অনলাইন কোর্সের সংখ্যাটিও সাবধানে পড়তে হবে। ‘অন্তত একটি’ অনলাইন কোর্স মানে এই নয় যে ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পুরো ডিগ্রিই ঘরে বসে করছেন। কেউ সপ্তাহের বেশির ভাগ ক্লাস ক্যাম্পাসে করেন, সঙ্গে একটি অনলাইন বিষয় নেন। আবার কেউ কাজ বা পারিবারিক দায়িত্বের কারণে আরও বেশি দূরশিক্ষার ওপর নির্ভর করেন। এই পার্থক্য না বুঝলে অনলাইন শিক্ষার বৃদ্ধি সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্ত আসবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চ্যালেঞ্জও এখানেই: সময় ও স্থান নিয়ে নমনীয়তা দিতে গিয়ে শেখার মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা ধরে রাখা।
ক্যাম্পাসগুলোর মধ্যে পড়াশোনার চলাচলও বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে পাঁচ বছরে একাধিক ক্যাম্পাসে কোর্স নেওয়ার সংখ্যা ২২ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ২৮২ হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী এক ক্যাম্পাসে ভর্তি থেকেও অন্য ক্যাম্পাসের সুযোগ নিতে পারলে বিষয় নির্বাচন বাড়তে পারে। ছোট ক্যাম্পাসে সব বিষয়ের শিক্ষক বা শ্রেণি না থাকলেও বড় ব্যবস্থার সম্পদ ভাগ করা সম্ভব হয়। অবশ্য বাস্তবে সময়সূচি, ক্রেডিট স্থানান্তর ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঠিক না থাকলে এই সুবিধা জটিলও হতে পারে। বৃদ্ধি তাই একটি সুযোগের সূচক, স্বয়ংক্রিয় সাফল্যের প্রমাণ নয়।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা ৪ হাজার ২৮৯। বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, স্কুলে পড়ার সময়ই কলেজ পর্যায়ের কোর্স নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা পাঁচ বছরে ১৮ শতাংশ বেড়েছে। অল্প বয়সে উচ্চশিক্ষার অভিজ্ঞতা পেলে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ভয় কমতে পারে, আগ্রহ বাড়তে পারে এবং পরবর্তী পড়াশোনার পথ পরিষ্কার হতে পারে। কিন্তু এর লাভ কতটা হচ্ছে, তা জানতে পরে এসব শিক্ষার্থীর ভর্তি, কোর্স শেষ করা এবং ডিগ্রি অর্জনের তথ্য দেখতে হবে। শুধু অংশগ্রহণ বেড়েছে বলে সবার জন্য সমান সুফল এসেছে ধরে নেওয়া যায় না।
হাওয়াইয়ের মতো দ্বীপমালায় দূরত্বের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। সব শিক্ষার্থী একই ক্যাম্পাসের কাছাকাছি থাকেন না। অনলাইন কোর্স ও ক্যাম্পাস-সীমানা পেরিয়ে পাঠ নেওয়ার সুযোগ তাই কেবল প্রযুক্তির চমক নয়; অনেকের জন্য শিক্ষায় পৌঁছানোর বাস্তব রাস্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ বলছে, স্কুলপড়ুয়া, বদলি হয়ে আসা শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পথ আরও পরিষ্কার করতে তারা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এই দাবি কতটা ফলপ্রসূ, তা ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থী অভিজ্ঞতা ও ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
সংখ্যাগুলো তাই দুটি গল্প একসঙ্গে বলে। একটি হলো, দশ ক্যাম্পাসের মোট ভর্তি আবার ৫০ হাজারের ওপরে। অন্যটি হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ধরন বদলাচ্ছে—একটি কোর্স অনলাইনে, আরেকটি অন্য ক্যাম্পাসে, কখনো স্কুলের সময়ই কলেজের শুরু। আগামী প্রশ্নটি শুধু আরও কতজন ভর্তি হলেন নয়; এই নমনীয় পথগুলো কতজনকে ভালোভাবে পড়া শেষ করতে সাহায্য করছে।
আরেকটি সতর্কতা হলো, ভর্তি সংখ্যা শিক্ষার মানের একমাত্র মাপকাঠি নয়। কোনো শিক্ষার্থী ক্লাস শুরু করেছেন, কিন্তু অর্থের অভাবে মাঝপথে থেমে গেলেন কি না, সেই তথ্যও সমান জরুরি। বিশেষ করে অনলাইন শিক্ষায় প্রবেশাধিকার, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট এবং শেখার সহায়তা সমানভাবে পাওয়া হচ্ছে কি না, তা দেখলে এই বৃদ্ধির অর্থ আরও পরিষ্কার হবে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!