পশ্চিমবঙ্গের একটি ছোট গ্রামে জন্ম শাহিদা ফকিরের। নিজের ভোটাধিকার নিয়ে কখনো সংশয়ে ছিলেন না তিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই অধিকার হারিয়ে ফেলেন। ভারতের জন্মসনদ এবং ১৯৬২ সাল থেকে গ্রামের পারিবারিক জমির নথিপত্র কর্মকর্তাদের সামনে হাজির করেছিলেন তিনি। কয়েক দশক ধরে তার মা-বাবার নামও ভোটার তালিকায় ছিল। সেটির প্রমাণও দেখিয়েছিলেন শাহিদা। কিন্তু এপ্রিলে চূড়ান্ত সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, তাতে তার নাম নেই।
দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া ৩৮ বছর বয়সী এই অভিবাসী শ্রমিক একা নন। গত বছর থেকে ভারতের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। সংখ্যাটি জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন' বা এসআইআর নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব নাম বাদ দেওয়া হয়। ভারতের স্বাধীনতার পর প্রায় আট দশকে এত অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার নজির নেই।
গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদির সরকার এসআইআরকে ভোটার তালিকা বিশুদ্ধ করার একটি বৈধ প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছে। নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে এতে লাখ লাখ মৃত ও একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন লাখ লাখ জীবিত ভারতীয় নাগরিকও।
সমালোচকদের অভিযোগ, অবৈধ অভিবাসীদের নাম বাদ দিয়ে ভারতের ভোটার তালিকা 'বিশুদ্ধ' করার প্রতিশ্রুতিকে বরং আরও অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কয়েক কোটি মুসলিম, অন্যান্য সংখ্যালঘু, দরিদ্র ও নিম্নবর্ণের মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, যাদের বড় একটি অংশ বিজেপির ভোটার নন।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসআইআর নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বৃহত্তম শহরগুলোর রাজপথে। এতে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহান্তে দিল্লি পরিণত হয় কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত দুর্গে। ব্যারিকেড, সড়কে প্রতিবন্ধকতা এবং হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। এসআইআর পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ ঠেকাতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়।
সোমবার বিরোধী দলগুলোও রাজধানীতে মিছিল করে। মোদি সরকারের বিরুদ্ধে এসআইআরকে 'ভোট চুরির হাতিয়ার' হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তোলা দলগুলো এদিন কয়েক হাজার সমর্থককে নিয়ে রাস্তায় নামে এবং সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন জমা দেয়। এতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করা হয়। শনিবারের কর্মসূচির ডাক দেওয়া তরুণদের নেতৃত্বাধীন 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) জানিয়েছে, এসআইআরের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।
বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের নেতাদের অভিযোগ, এসআইআরের কারণে ইতোমধ্যে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বিজেপি নির্বাচনি সুবিধা পেয়েছে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। অন্যদের মতে, এই প্রক্রিয়ার প্রভাব আরও উদ্বেগজনক। জ্ঞানেশ কুমারের একক সিদ্ধান্তে এসআইআরে আনা পরিবর্তনের ফলে নির্বাচন কমিশন কার্যত ভারতীয় নাগরিকত্ব নির্ধারণের কর্তৃত্ব পেয়ে গেছে, যা কমিশনের নির্ধারিত দায়িত্বের অনেক বাইরে।
এর প্রভাব ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সেখানে নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর 'অবৈধ' অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। এ জন্য কয়েকটি নতুন আটককেন্দ্রও তৈরি করা হয়েছে। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর দাবি, এসআইআরের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে মুসলিমদের।
শাহিদা ফকিরও তাদের একজন। ভোটার তালিকা প্রকাশের মাত্র তিন মাস পর, তালিকা থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে তার আবেদনের শুনানি চলার মধ্যেই পুলিশ তাকে আটক করে। তার বিরুদ্ধে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী হওয়ার অভিযোগ আনা হয়। জুলাইয়ে তাকে সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়। এর আগে তিনি কখনো বাংলাদেশে যাননি, এমনকি দেশটির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কও ছিল না। এরপর থেকে সেখানেই আটকে আছেন তিনি।
বাংলাদেশ সীমান্তের একটি গ্রামে আশ্রয় নেওয়া শাহিদা কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফোনে বলেন, "আমি ভারতীয় নাগরিক, তা প্রমাণ করার জন্য আমার কাছে সব নথিপত্র আছে। আমি পুলিশের পায়ে পড়ে বাংলাদেশে না পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তারা আমাকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিয়েছে।"
বাংলাদেশের এক সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তা শাহিদার বর্ণনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, "আমরা তার সব নথিপত্র পরীক্ষা করেছি এবং নিশ্চিত হয়েছি যে তিনি ভারতীয় নাগরিক।" সেপ্টেম্বরে শাহিদার পরিবার তার বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। এ বিষয়ে জবাব দেওয়ার জন্য ভারত সরকারকে এক মাস সময় দেন আদালত।
শাহিদা বলেন, "আমি শুধু আমার পরিবার ও ভারতের বাড়িতে ফিরে যেতে চাই। সেই দিনের জন্য মরিয়া হয়ে অপেক্ষা করছি।" পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার বিরুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের আবেদন জমে থাকায় তার মামলার শুনানি হতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে যাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই নিজেদের দেশেই বিদেশি হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার আতঙ্কের কথা বলছেন। কারও কারও সরকারি সুবিধাও বন্ধ হয়ে গেছে।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ৮০ বছর বয়সী মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ সিদ্দিকী বলেন, তার দাদা ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন এবং পরিবারের তিন প্রজন্মের নাম ভোটার তালিকায় ছিল। কিন্তু এসআইআরের পর নিজের নাম বাদ পড়তে দেখে তিনি 'অপমানিত' বোধ করছেন।
তিনি বলেন, "ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম মুছে যাওয়ার পর থেকে আমি সব সময় আতঙ্কে থাকি। যদি তারা আমাকে আটকশিবিরে পাঠিয়ে দেয়? এই বয়সে সন্তান ও নাতি-নাতনিদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা আমি ভাবতেও পারি না, বিশেষ করে যখন আমার পূর্বপুরুষদের সবাইকে ভারতেই দাফন করা হয়েছে।"
সমালোচকদের মতে, সমস্যার সূত্রপাত ২০২৩ সালে। ওই বছর মোদি সরকার তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠনের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনে। এর ফলে প্রথমবারের মতো কমিশনে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে চলে যায়। কয়েক মাসের মধ্যেই মোদির নেতৃত্বাধীন প্যানেল বিরোধীদের আপত্তি সত্ত্বেও জ্ঞানেশ কুমারকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া অধ্যয়ন কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ ফেলো রনোজয় সেন বলেন, "কয়েক দশক ধরে নির্বাচন কমিশন ছিল আমাদের তুলনামূলকভাবে বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। কিন্তু এখন সেই স্বাধীনতা ক্ষয় হয়েছে।"
পরের বছর নতুন নির্বাচন কমিশন বিহার থেকে এসআইআর কার্যক্রম শুরু করে। সেখানে ৬০ লাখের বেশি নাম বাদ দেওয়ার পরপরই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। সংশোধন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কিছুদিন পর বিহারের রাজ্য নির্বাচনে বড় জয় পায় বিজেপি।
কয়েক মাস ধরে এসআইআর নিয়ে উদ্বেগ চললেও গত মাসে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার একটি প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তা দেশজুড়ে বিক্ষোভে রূপ নেয়নি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য ১৪টি আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার এককভাবে সেগুলো নাকচ করে দেন।
রনোজয় সেন বলেন, "ভারত সব সময়ই ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ছিল। তবে অন্তত নাগরিকেরা মনে করতেন, তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে এবং নিয়মিত ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। সেই অধিকার কেড়ে নিয়েছে এসআইআর। যেভাবে এটি পরিচালনা করা হয়েছে, তাতে বিজেপির নির্বাচনি সম্ভাবনা বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে করা কঠিন।"
ভারতের সাবেক তিন নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যেই এসআইআরের সমালোচনা করেছেন। তাদের ভাষায়, এটি একটি 'শত্রুভাবাপন্ন পদক্ষেপ', যা ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে বাদ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে দেশের ভোটার তালিকার পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করেছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ওপি রাওয়াত ভোটার নিবন্ধন ফরমে আনা পরিবর্তনকে 'ভুল ও অবৈধ' বলে বর্ণনা করেছেন।
২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বে থাকা অশোক লাভাসা এসআইআর বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন। গত মাসে তিনি বলেন, "দেশের লাখ লাখ মানুষের ওপর একটি অন্যায্য প্রক্রিয়া চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর বিচার বিভাগ সেটিকে বৈধতা দিয়েছে। ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?"
২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বে থাকা এসওয়াই কুরেশি সবচেয়ে কঠোর ভাষায় এসআইআরের বিরোধিতা করেছেন। তার অভিযোগ, "এটি একটি জাতীয় হয়রানিমূলক কার্যক্রম, যার উদ্দেশ্য মুসলিমদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। ভারতের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায় হলো বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনর্বহাল করা।"
এদিকে এসআইআর প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিজেপি। দলটি সাম্প্রতিক নির্বাচনি বিজয় নিয়ে 'ঈর্ষান্বিত' হওয়ার অভিযোগ তুলেছে বিরোধী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। বিজেপির বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিরা চাইলে আবার নিবন্ধন করতে পারবেন।
বিজেপির মুখপাত্র সুধাংশু ত্রিবেদী অভিযোগগুলোকে 'অপতথ্য' বলে অভিহিত করেছেন। তার দাবি, বিরোধীরা বিভাজন ও নৈরাজ্যের পরিবেশ তৈরি করতে পরিকল্পিত প্রচার চালাচ্ছে। তবে নির্বাচন কমিশনও প্রক্রিয়াটির কিছু ত্রুটি কার্যত স্বীকার করেছে বলে মনে হচ্ছে।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে কমিশন দেরিতে হলেও ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন জমা দেওয়ার ফরমের সংখ্যার ওপর সীমা আরোপ করে। এসব ফরমের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি অন্যদের পক্ষেও আপত্তি জানাতে পারেন। এর আগে বৈধ মুসলিম ভোটারদের লক্ষ্য করে কয়েক হাজার ফরম জমা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।
এদিকে জনরোষ বাড়ছেই। দিল্লিতে এসআইআরের কারণে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। চলতি সপ্তাহেও সেখানে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। দিল্লিতে ৩০ বছর ধরে বসবাস করছেন ৬০ বছর বয়সী প্রশান্ত ট্যান্ডন। ভোটার হিসেবে তার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাড়িতে নোটিশ পাঠানো হলে তিনি বিস্মিত হন।
ক্ষুব্ধ ট্যান্ডন বলেন, "কেউ যদি আমার নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ করে, তাহলে আমার বিরুদ্ধে প্রমাণ হাজির করা উচিত।" তিনি জানান, তরুণদের সঙ্গে তিনিও বিক্ষোভে অংশ নেবেন। তিনি বলেন, "আমি যে ভারতীয় নাগরিক, তা আমাকে প্রমাণ করতে হবে না।"
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!