সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিচ্ছেন—শিরোনামটি শুনে মনে হতে পারে তিনি এবার নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পুরো সময় পড়াবেন। বাস্তব ছবিটি একটু আলাদা। নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনিতে ‘প্রফেসর অব প্র্যাকটিস’ হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ অক্টোবরের ঘোষণায় বলা হয়েছে, অক্টোবর থেকেই তাঁর কাজ শুরু হবে। তিনি অতিথি বক্তৃতা, বিশেষ কর্মশালা ও পরামর্শদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের সঙ্গে কাজ করবেন। এটি পূর্ণকালীন শিক্ষকতার পদ নয়। তবে উচ্চশিক্ষায় বাস্তব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কীভাবে কাজে লাগে, সেই প্রশ্নে নিয়োগটি মনোযোগ কেড়েছে।
আরডার্নের কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় সহমর্মিতাপূর্ণ নেতৃত্ব, সামাজিক সংহতি, নাগরিক আস্থা এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যার কথা জানিয়েছে। তাঁর অবস্থান থাকবে মেডিসিন অ্যান্ড হেলথ অনুষদের স্কুল অব পাবলিক হেলথে। পাশাপাশি তিনি সিডনি পলিসি ল্যাব ও উপাচার্যের দপ্তরের উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত থাকবেন। অর্থাৎ একটি বিভাগের নির্দিষ্ট কোর্সের চেয়ে বিস্তৃত বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে আলোচনার ভূমিকা এখানে বেশি। ঘোষণাটিকে ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী এখন নিয়মিত অধ্যাপক’ বলে সরল করলে নিয়োগের প্রকৃতি অস্পষ্ট হয়ে যাবে।
‘প্রফেসর অব প্র্যাকটিস’ পদটির উদ্দেশ্য সাধারণত পেশাগত অভিজ্ঞতাকে একাডেমিক পরিবেশে নিয়ে আসা। সব ক্ষেত্রে এই পদ একই রকম নয়, এবং গবেষণায় প্রচলিত অধ্যাপক পদের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনা, সংকট মোকাবিলা বা জননীতির কাজ করে থাকলে শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া জানতে পারেন। কিন্তু অভিজ্ঞতা আছে বলেই প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি হলো অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রমাণ, সমালোচনা ও মতভেদকে জায়গা দেওয়া।
আরডার্ন ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর সময়ে ক্রাইস্টচার্চের সন্ত্রাসী হামলা, হোয়াকারি আগ্নেয়গিরির বিপর্যয় এবং কোভিড-১৯ মহামারির মতো বড় সংকট আসে। এসব ঘটনা নেতৃত্ব নিয়ে বাস্তব আলোচনার উপাদান হতে পারে: অনিশ্চিত তথ্যের মধ্যে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কীভাবে নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়, এবং কঠিন বিধিনিষেধের সামাজিক মূল্য কীভাবে বিচার করা হয়। প্রশংসা ও সমালোচনা—দুই দিকের প্রশ্ন থাকলেই এমন শিক্ষা আরও গভীর হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, তাঁর কাজের একটি লক্ষ্য স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সমতা, অন্তর্ভুক্তি ও কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া। জনস্বাস্থ্যের সিদ্ধান্ত শুধু হাসপাতাল বা ওষুধের বিষয় নয়; মানুষের আস্থা, বার্তার ভাষা এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছানোর প্রশ্নও আছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা এখানে গবেষকদের সঙ্গে নতুন কথোপকথন খুলতে পারে। তবে কোনো নতুন গবেষণা প্রকল্পের ফল বা শিক্ষানীতির পরিবর্তন এই নিয়োগ ঘোষণায় জানানো হয়নি। ভবিষ্যৎ ফলাফল সম্পর্কে আগাম নিশ্চিত বক্তব্য দেওয়া তাই ঠিক হবে না।
শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হতে পারে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ। নেতৃত্বের আদর্শ নিয়ে বক্তৃতা শোনা সহজ; কঠিন সিদ্ধান্তের সময় বিকল্পগুলো কী ছিল, ভুলের সম্ভাবনা কীভাবে দেখা হয়েছিল এবং ভিন্নমতের মানুষকে কীভাবে শোনা হয়েছিল—এসব প্রশ্ন বেশি শিক্ষণীয়। বিশ্ববিদ্যালয় অতিথি বক্তৃতা, মাস্টারক্লাস এবং মেন্টরিংয়ের কথা বলেছে। কোন শিক্ষার্থী কখন এসব সুযোগ পাবেন, তা ভবিষ্যৎ আয়োজনের বিস্তারিত থেকে জানা যাবে। ঘোষণার সঙ্গে কোনো বাধ্যতামূলক কোর্স বা ভর্তি সুবিধার কথা বলা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মার্ক স্কট আরডার্নের জননেতৃত্বের অভিজ্ঞতাকে শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন। আরডার্ন নিজেও জানিয়েছেন, সরকার ছাড়ার পর থেকে নেতৃত্বের প্রশ্ন তাঁকে বিশেষভাবে ভাবাচ্ছে। এসব বক্তব্য নিয়োগের উদ্দেশ্য বুঝতে সাহায্য করে, কিন্তু তার শিক্ষাগত সাফল্যের প্রমাণ নয়। সেই মূল্যায়ন করতে হলে দেখতে হবে আলোচনা কতটা উন্মুক্ত হলো, শিক্ষার্থীরা কতটা অংশ নিতে পারলেন এবং গবেষণায় বাস্তব অবদান তৈরি হলো কি না। নামী ব্যক্তির উপস্থিতি নিজে থেকে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করে না।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছেও বিষয়টি আগ্রহের। জননীতি, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের শিক্ষায় বাস্তব অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত সংকট মোকাবিলার মতো জটিল বিষয়ে। তবে একজন রাজনৈতিক নেতার বয়ানকে একমাত্র শিক্ষা হিসেবে গ্রহণের ঝুঁকি আছে। একই ঘটনার সরকারি নথি, স্বতন্ত্র গবেষণা এবং প্রভাবিত মানুষের অভিজ্ঞতা পাশাপাশি পড়লে শিক্ষার্থীরা আরও শক্ত ভিত্তি পান। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব হবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে পরীক্ষা করা যায় এমন আলোচনার সঙ্গে যুক্ত রাখা।
নিয়োগের একটি প্রতীকী দিকও আছে। রাজনীতির মঞ্চ থেকে শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণাগারের দিকে যাত্রা দেখায়, নেতৃত্বের প্রশ্ন শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু, স্বাস্থ্য, ডিজিটাল নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক বিভাজনের মতো সমস্যায় বিভিন্ন শাখার জ্ঞান প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় যদি এসব প্রশ্নে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিজ্ঞ নীতিনির্ধারকের সংলাপ ঘটাতে পারে, তবেই পদটির সম্ভাবনা কাজে লাগবে। সেই সম্ভাবনা বাস্তব কি না, তা পরবর্তী কাজেই বোঝা যাবে।
আগামী ১ নভেম্বর সিডনি অপেরা হাউসে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও একে অন্যের কথা শোনার বিষয় নিয়ে আরডার্নের একটি আলোচনায় অংশ নেওয়ার কথা বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে। সেটিও তাঁর নতুন ভূমিকার সঙ্গে মানানসই একটি শুরু, তবে সংবাদ প্রকাশের সময় অনুষ্ঠানটি এখনো ভবিষ্যতের। তাই উপস্থিতি বা আলোচনার ফল নিয়ে কোনো দাবি করা যায় না। আপাতত নিশ্চিত খবর একটাই: সাবেক প্রধানমন্ত্রী নতুন এক শিক্ষাগত ভূমিকায় যাচ্ছেন। এর প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে তিনি কী বলেন তার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা তাঁকে কী প্রশ্ন করতে পারেন, তার ওপর।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!