কেনিয়ায় ইবোলা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে নয়জনে পৌঁছেছে। ২০ অক্টোবর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, নতুন শনাক্ত ব্যক্তি প্রথম রোগীর পরিচিত সংস্পর্শে ছিলেন এবং উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই কোয়ারেন্টিনে ছিলেন। এই তথ্যটি সংখ্যার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আক্রান্তের সংখ্যা বাড়া উদ্বেগের হলেও শনাক্ত ব্যক্তি আগে থেকে নজরদারিতে থাকা সংস্পর্শের তালিকায় থাকলে সংক্রমণের পথ অনুসরণ করার সুযোগ থাকে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রথম রোগীর পরিচিত যোগাযোগের বাইরের কোনো সংক্রমণের প্রমাণ তারা পায়নি।
প্রথম রোগী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে উগান্ডা হয়ে কেনিয়ায় পৌঁছেছিলেন। ৩ অক্টোবর নাইরোবিতে আসার পর ৫ অক্টোবর তাঁর পরীক্ষায় ইবোলা ধরা পড়ে এবং সেদিনই তিনি মারা যান। কেনিয়া প্রথম ঘটনা ঘোষণা করে ৬ অক্টোবর। এরপর তাঁর পরিবারের চারজন এবং তাঁকে সেবা দেওয়া চার স্বাস্থ্যকর্মীর পরীক্ষায় সংক্রমণ ধরা পড়েছে বলে এপি জানিয়েছে। সর্বশেষ রোগী যোগ হলে মোট নয়জন হয়। এ ঘটনাগুলো একটিই পরিচিত সংক্রমণগুচ্ছের মধ্যে আছে—এটাই এখনকার সরকারি মূল্যায়ন, চিরস্থায়ী নিশ্চয়তা নয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে নয় রোগীর সঙ্গে যুক্ত ১৩৫ জন সম্ভাব্য সংস্পর্শ শনাক্ত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ১৩৪ জন কোয়ারেন্টিনে আছেন। এই সংখ্যা প্রতিদিন বদলাতে পারে, কারণ অনুসন্ধান চললে নতুন মানুষের নাম যোগ হয় বা পুরোনো তথ্য সংশোধিত হয়। ‘সংস্পর্শ’ মানেই আক্রান্ত নন; তাঁদের স্বাস্থ্য নির্দিষ্ট সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। আবার যিনি এখন সুস্থ দেখাচ্ছেন, তাঁর পর্যবেক্ষণকাল শেষ হওয়ার আগে ঝুঁকি পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না। তাই দৈনিক হিসাব পড়ার সময় রোগী, সংস্পর্শ এবং কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তি—এই তিনটি দল আলাদা রাখতে হবে।
ইবোলা সংক্রমণের প্রধান পথ আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, বমি বা অন্য শরীরের তরলের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ, অথবা সেই তরলে দূষিত জিনিসের সংস্পর্শ। রোগীর যত্ন নেওয়া আত্মীয় ও স্বাস্থ্যকর্মীরা তাই যথাযথ সুরক্ষা ছাড়া বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। কিন্তু একই শহরে থাকা বা খবরটি পড়া মাত্রই কেউ সংক্রমিত হয়েছেন, এমন নয়। উপসর্গ ও সংস্পর্শের ইতিহাস থাকলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে দ্রুত যোগাযোগ করা প্রয়োজন; নিজের অনুমানে রোগ নির্ণয় করা বা পরিচিত রোগীকে লুকিয়ে রাখা পরিস্থিতি খারাপ করতে পারে।
এপি জানিয়েছে, প্রথম দফার কয়েকজন সংস্পর্শের ২১ দিনের পর্যবেক্ষণ ২৫ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা। যাঁদের ওই সময় উপসর্গ দেখা যাবে না, তাঁদের বাড়ি ফেরার সুযোগ থাকবে। মন্ত্রণালয় স্থানীয় মানুষকে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করার অনুরোধ করেছে। রোগী বা তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে কাউকে স্থায়ীভাবে বিপজ্জনক ভাবা ভুল। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম যেমন জরুরি, তেমনি তথ্যভিত্তিক আচরণও জরুরি; ভয় ও অপবাদ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে।
কেনিয়ার ঘটনাটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটের মধ্যেই ঘটছে। কঙ্গোতে চলমান ইবোলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আছে, কিন্তু কঙ্গোর মোট আক্রান্ত বা মৃতের সংখ্যা সরাসরি কেনিয়ার ঝুঁকির পরিমাপ নয়। দুই দেশের নজরদারি, যাতায়াত, পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং সংস্পর্শের শৃঙ্খল আলাদা করে দেখতে হয়। বিদেশ থেকে রোগ আসতে পারে বলেই সীমান্তের খবর গুরুত্বপূর্ণ; একই কারণে কোনো দেশ সম্পর্কে অতিরঞ্জিত আতঙ্ক ছড়ানোও ক্ষতিকর। সঠিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে তার তারিখ উল্লেখ করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার তথ্য আরেকটি শিক্ষা দেয়। শুধু রোগ শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; সুরক্ষা সরঞ্জাম পরা ও খোলা, নমুনা নেওয়া, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রশিক্ষণের প্রতিটি ধাপ ঠিকমতো কাজ করছে কি না, সেটিও পরীক্ষা দরকার। প্রতিরক্ষামূলক পোশাকের ছবি দেখলেই বাস্তব প্রস্তুতির মান বোঝা যায় না। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত সরঞ্জাম এবং রোগীকে দ্রুত আলাদা রাখতে পারার সক্ষমতা মিলেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
২১ অক্টোবরের জন্য মূল প্রশ্ন তাই ‘নয়জন’ সংখ্যাটি কত ভয়ংকর, শুধু তা নয়। তাঁদের সংক্রমণের পথ জানা আছে কি, নতুন সংস্পর্শদের সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে কি, আর পর্যবেক্ষণ থেকে বাইরে কোনো ঘটনা ধরা পড়ছে কি—এই তিন প্রশ্নের উত্তর বেশি কাজে আসে। এখনকার প্রকাশিত তথ্য একটি পরিচিত গুচ্ছের কথাই বলে। পরবর্তী সরকারি প্রতিবেদনে সেই চিত্র একই থাকে, নাকি বদলায়, তা নজরে রাখাই সবচেয়ে দায়িত্বশীল পথ।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!