উৎসবের রঙে সাজছে...
আন্তর্জাতিক

এক যুগের বেশি অপেক্ষার সেতুতে কিমের সফর: চীন–উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে কী বদলাচ্ছে?

এক যুগের বেশি অপেক্ষার সেতুতে কিমের সফর: চীন–উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে কী বদলাচ্ছে?
লেখা বড়/ছোট করুন:

সীমান্তে একটি সেতু খুলে দেওয়া নিছক অবকাঠামোর খবর মনে হতে পারে। কিন্তু চীনের দানদং শহরে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সাম্প্রতিক সফর সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছে। ইয়ালু নদীর ওপর নতুন সেতু দিয়ে চীনে প্রবেশ করে তিনি এমন এক সময় বৈঠক করেছেন, যখন বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্ক, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা একসঙ্গে আলোচনায়। দীর্ঘদিনের বিলম্ব পেরিয়ে সেতু চালু হলেও সেটি দিয়ে ভবিষ্যতে কতটা বাণিজ্য বা যাতায়াত হবে, তার নিশ্চয়তা এখনো নেই। তাই ঘটনাটি প্রতীকী এবং ব্যবহারিক—দুই দিক থেকেই কৌতূহল জাগাচ্ছে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২৪ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিম শনিবার নতুন সেতু পেরিয়ে চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় দানদংয়ে যান। দক্ষিণ কোরিয়ার একত্রীকরণ মন্ত্রণালয় এবং চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া সফরের তথ্য নিশ্চিত করেছে। সেখানে চীনের জ্যেষ্ঠ নেতা ওয়াং হুনিং তাঁর সঙ্গে ছিলেন। সিনহুয়ার বিবরণে বলা হয়েছে, তাঁরা কোরীয় যুদ্ধের সময়ে চীনা সহায়তার স্মৃতিবাহী একটি স্মারকে শ্রদ্ধা জানান এবং একটি গাড়ি কারখানাও পরিদর্শন করেন। ফেরার পথে নতুন চীন–উত্তর কোরিয়া ইয়ালু নদী সেতুতে ওয়াং তাঁকে বিদায় জানান।

এই সফরের সময়ও তাৎপর্যপূর্ণ। ২৫ অক্টোবর চীনে কোরীয় যুদ্ধসংক্রান্ত একটি বিজয়ের বার্ষিকী স্মরণ করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের স্মারকে শ্রদ্ধা জানানো দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধনের বার্তা দেয়। তবে ইতিহাসের ভাষা আর আজকের নীতির বাস্তবতা এক নয়। দুই দেশের সরকার সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বললেও কোন খাতে কত দ্রুত পরিবর্তন আসবে, তা জানতে নির্দিষ্ট চুক্তি, সীমান্ত পরিচালনা ও চলাচলের তথ্য দেখতে হবে। সফরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিয়ে ভবিষ্যতের বাণিজ্যের পরিমাণ হিসাব করা যায় না।

সেতুটির দীর্ঘ অপেক্ষা নিজেই একটি গল্প। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নতুন সংযোগটি এক দশকের বেশি সময় বিলম্বের পর চালু হয়েছে। সীমান্ত সেতুতে রাস্তা থাকলেই অর্থনৈতিক প্রবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুরু হয় না। পণ্য পরিবহনে শুল্ক ব্যবস্থা, অনুমতি, অবকাঠামো, পরিবহন সংযোগ এবং দুই দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লাগে। উত্তর কোরিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। তাই সেতু চালুর সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্যে বড় উল্লম্ফন ঘটেছে—এমন দাবি করার মতো প্রকাশ্য তথ্য এখনো নেই।

চীনের জন্য উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব বহুদিনের। পিয়ংইয়ংয়ের জন্য বেইজিং একটি প্রধান প্রতিবেশী ও অর্থনৈতিক সংযোগ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করেছে। এ অবস্থায় চীনের মাটিতে কিমের সফর দুই দেশের পারস্পরিক গুরুত্ব প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এটিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শনের পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছে। তবে একটি সফর থেকেই চীন, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সম্পর্কের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে বলা অতিরঞ্জন হবে।

সিনহুয়া জানিয়েছে, ওয়াং হুনিং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের শুভেচ্ছা পৌঁছে দিয়েছেন। কিম দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব এবং বাস্তব সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহের কথা বলেছেন। এসব বক্তব্য দুই পক্ষের নিজস্ব অবস্থান; স্বাধীনভাবে যাচাই করা অর্থনৈতিক ফলাফল নয়। পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, ঘোষিত ইচ্ছা, কূটনৈতিক প্রতীক এবং বাস্তব পরিবর্তন আলাদা জিনিস। নতুন সেতুর ওপর দিয়ে নেতার গাড়ি পার হওয়া দৃশ্যটি স্মরণীয় হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনের মাপ হবে পরবর্তী মাসগুলোর সীমান্ত চলাচল ও নীতিগত সিদ্ধান্ত।

এই সফর তাই একসঙ্গে দুটি প্রশ্ন রেখে গেল। প্রথমত, বহু বছরের অপেক্ষার পর সেতুটি সাধারণ পণ্য ও মানুষের চলাচলে কতটা ব্যবহৃত হবে? দ্বিতীয়ত, চীন–উত্তর কোরিয়ার সহযোগিতার ভাষা আঞ্চলিক কূটনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে? আপাতত নিশ্চিত তথ্য হলো সফর হয়েছে, নতুন সেতু চালু হয়েছে এবং দুই পক্ষ সম্পর্ক জোরদারের বার্তা দিয়েছে। এর বাইরে বড় পরিবর্তনের দাবি করতে হলে আরও প্রকাশ্য প্রমাণের অপেক্ষা করতে হবে।

দানদংয়ের এই সংযোগের দিকে তাই শুধু কূটনীতিক নয়, সীমান্ত অঞ্চলের ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর পর্যবেক্ষকেরাও তাকিয়ে থাকবেন। পরের খবর আসবে সেতুর দৈনন্দিন ব্যবহারের তথ্য থেকে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!