ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার ভারতের বেঙ্গালুরুতে শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের একটি কেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে খবরটি আকর্ষণীয়: এর অর্থ কি ভারতে বসেই ম্যানচেস্টারের ডিগ্রি করা যাবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত ঘোষণায় এখনই এমন কোনো ভর্তি কার্যক্রম, নতুন ডিগ্রি বা শুরুর তারিখ দেওয়া হয়নি। পরিকল্পনাটি মূলত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গবেষক, শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই ‘কেন্দ্রের পরিকল্পনা’ আর ‘চালু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস’—দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি বেঙ্গালুরুর শিক্ষা, প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতের সঙ্গে তার পুরোনো সম্পর্ক আরও গভীর করবে। শহরটি ভারতের বড় প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলোর একটি। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নতুন কোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসা এক জায়গায় কাজ করে। ম্যানচেস্টারের পরিকল্পনায় শ্রেণিকক্ষের জ্ঞানকে বাস্তব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার কথা আছে। শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মস্থলভিত্তিক প্রকল্প, স্বল্পমেয়াদি কাজের অভিজ্ঞতা এবং গবেষণার সহযোগিতা তৈরির সম্ভাবনা দেখছে কর্তৃপক্ষ। তবে সম্ভাবনা মানেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত internship বা চাকরি নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাজ্যে ‘পার্টনার এনাবলড লার্নিং’ নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে। এতে প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা বা সামাজিক উদ্যোগের বাস্তব সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীরা পাঠক্রমের অংশ হিসেবে কাজ করতে পারেন। ঘোষণায় বলা হয়েছে, বেঙ্গালুরু কেন্দ্রেও সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় ম্যানচেস্টার। ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ডিগ্রি শেষ করে কাজের জগতে প্রবেশের সময় অনেক শিক্ষার্থী জানতে পারেন যে শুধু পরীক্ষার নম্বর যথেষ্ট নয়। দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ এবং বাস্তব পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতাও প্রয়োজন। কিন্তু নতুন কেন্দ্রে এই সুযোগ কীভাবে দেওয়া হবে, তার বিস্তারিত এখনও ঘোষিত হয়নি।
ভারতে ম্যানচেস্টারের সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ আগে থেকেই রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় রিলায়েন্স, টাটা ও ইনফোসিসের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলেছে; পাশাপাশি গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় কয়েকটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার উল্লেখ করেছে। বেঙ্গালুরুর পরিকল্পনা সেই সম্পর্কের ওপর দাঁড়াবে বলে তারা আশা করছে। এটি ভারত ও যুক্তরাজ্যের বৃহত্তর শিক্ষা যোগাযোগের অংশও হতে পারে। তবে একটি ঘোষণায় অংশীদারের নাম থাকা মানেই কোনো নির্দিষ্ট কোর্স বা প্রকল্পে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত চুক্তি হয়ে গেছে—এমন ধরে নেওয়া উচিত নয়।
এই ঘোষণা এসেছে ১২ থেকে ১৬ অক্টোবর ভারত সফর করা উত্তর ইংল্যান্ডের শিক্ষা, ব্যবসা ও নাগরিক প্রতিনিধিদের একটি দলের কার্যক্রমের মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডানকান আইভিসন বেঙ্গালুরুতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের কথা বলেছেন। ম্যানচেস্টারের ইতিমধ্যে দুবাই, হংকং, সাংহাই ও সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক কেন্দ্র আছে। ফলে বিদেশে উপস্থিতি বাড়ানো তাদের জন্য একেবারে নতুন ধারণা নয়। তবু প্রতিটি কেন্দ্রের কাজ আলাদা হতে পারে; বেঙ্গালুরুর প্রস্তাবকে অন্য শহরের কেন্দ্রের সঙ্গে এক নিয়মে বিচার করা যাবে না।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এই খবর থেকে কী বুঝবেন? প্রথমত, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দেখে ভর্তি বিজ্ঞাপন বিশ্বাস করার আগে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট কোর্স, অবস্থান, ফি ও ডিগ্রির স্বীকৃতি যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোনো প্রতিষ্ঠানের ‘কেন্দ্র’ গবেষণা বা ব্যবসায়িক যোগাযোগের জায়গা হতে পারে; সেটি নিজে পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি দেওয়ার স্থান না-ও হতে পারে। তৃতীয়ত, কাজের অভিজ্ঞতার সুযোগ ঘোষণায় থাকলেও তা কাদের জন্য, কোন যোগ্যতায় এবং কী খরচে পাওয়া যাবে, সেই নিয়ম আলাদা করে দেখতে হবে।
প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা উপকারী হবে, তা বাস্তব কার্যক্রম শুরু হলে বোঝা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় কি নতুন যৌথ গবেষণা গড়বে? শিক্ষার্থীরা কি সত্যিই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে অংশ নিতে পারবেন? স্থানীয় অংশীদারেরা কী লাভ পাবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও খোলা। বর্তমানে নিশ্চিত তথ্য হলো, ম্যানচেস্টার বেঙ্গালুরুতে একটি কেন্দ্র গড়তে চায় এবং শিক্ষা ও কাজের সম্পর্ক গভীর করতে চায়। সম্ভাবনার খবরটি বড়; ভর্তি বা ডিগ্রির প্রতিশ্রুতি হিসেবে পড়ার আগে ঘোষণার সীমাটুকু মনে রাখা দরকার।
এ ধরনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের কণ্ঠও জরুরি। পরিকল্পনা কী বলছে তার পাশাপাশি সুযোগ বাস্তবে কাদের কাছে পৌঁছায়, অংশ নেওয়ার শর্ত কতটা স্পষ্ট এবং অভিজ্ঞতা শেষে কী শেখা যায়, সেসব জানতে হবে। নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতি একা সফলতার প্রমাণ নয়; শেখার সুযোগ ও ফলই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!