ভারতের মণিপুর রাজ্যের নোনে জেলায় অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে বন্দুকযুদ্ধে তিন কুকি ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। শনিবারের (৩১ অক্টোবর) এ ঘটনার মধ্যেই কুকি-জো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের 'সাসপেনশন অব অপারেশনস' (সোও) চুক্তি বাতিল এবং স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোর নিরাপত্তা জোরদারের দাবিতে ইম্ফলে বিশাল সমাবেশ করেছেন মেইতেই ও নাগা সংগঠনের সদস্যসহ হাজার হাজার মানুষ।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার সকাল ১০টার দিকে কেক্রু নাগা গ্রামে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পুলিশের ভাষ্য, গত ২৯ অক্টোবর থেকে ওই এলাকায় নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের বলে সন্দেহ করা হচ্ছে—এমন অজ্ঞাতপরিচয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি চলছিল। তবে শনিবারের আগে তিন দিন ধরে এমন কোনো সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
পুলিশের বরাতে হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওই এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। নিহত তিনজন হলেন থাংলেনসাং সিংগন, থাংখোসেই হাওকিপ এবং লামিনসাং কিপগেন।
কুকিদের শীর্ষ সংগঠন কুকি ইনপি মণিপুর (কেআইএম) এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড-ইসাক মুইভা (এনএসসিএন-আইএম) এবং জেলিয়াংরং ইউনাইটেড ফ্রন্ট-কামসনকে (জেডইউএফ-কে) দায়ী করেছে। সংগঠনটির দাবি, নিহত তিনজনই গ্রামের স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন।
এক বিবৃতিতে কেআইএম বলেছে, নোনেই জেলায় এই তিন সাহসী গ্রাম স্বেচ্ছাসেবকের হত্যাকাণ্ডের সরাসরি কারণ হলো ঝুঁকিতে থাকা কুকি-জো সম্প্রদায়গুলোর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে রাজ্য সরকারের বেপরোয়া ব্যর্থতা।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে চারটি স্বয়ংক্রিয় অ্যাসল্ট রাইফেল, একটি একনলা রাইফেল, একটি ড্রোন, গোলাবারুদ এবং হাতবোমাসহ বিভিন্ন ইম্প্রোভাইজড বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে মেইতেই ও নাগা সম্প্রদায়ের যৌথ উদ্যোগে শনিবার ইম্ফলে বিশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৩ সালে জাতিগত সহিংসতা শুরুর পর মণিপুরে এটিকে অন্যতম বৃহৎ জনসমাবেশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কোঅর্ডিনেটিং কমিটি অন মণিপুর ইন্টিগ্রিটি (কোকোমি), ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউএনসি), জয়েন্ট ট্রাইবস কাউন্সিল (জেটিসি), ফুট হিলস নাগা কোঅর্ডিনেটিং কমিটি (এফএনসিসি), নাগা পিপলস ইউনিয়ন ইম্ফল (এনপিইউআই), নাগা হিউম্যানিটারিয়ান এইড কমিটি মণিপুর (এনএইচএসিএম), মণিপুর নাগা ইয়ুথ অর্গানাইজেশন (এমএনওয়াইও), অল নাগা স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন মণিপুর (এএনএসএএম) এবং পাহাড় ও উপত্যকা এলাকার বাসিন্দারা যৌথভাবে এ বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেন।
এর কয়েক দিন আগে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ১৪ জন মেইতেই পুরুষের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে তিনজন নিহত হন। ওই ঘটনার পর রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০৬ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারি থেকে কুকি ও নাগা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষে প্রায় ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
থাউ গ্রাউন্ডে আয়োজিত এক জনসমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা ছয় দফা প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এতে কেন্দ্রীয় সরকারের কথিত 'প্রক্সি যুদ্ধ' এবং 'নারকো-টেরোরিজম'কে সমর্থন বন্ধের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে একটি নিরপেক্ষ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান জানানো হয়। সমাবেশে গত ২৪ সেপ্টেম্বর মেয়াদ শেষ হওয়া সোও চুক্তি কোনো অবস্থাতেই নবায়ন না করার দাবিও তোলেন বিক্ষোভকারীরা। পাশাপাশি চুক্তির আওতায় নির্ধারিত শিবিরগুলো ভেঙে দেওয়া, অস্ত্র জব্দ এবং চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
২০২৩ সালের ৩ মে থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষের স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবিও জানানো হয়। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া এবং জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আরেকটি প্রস্তাবে ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে আসাম রাইফেলসের পরিবর্তে নিরপেক্ষ ও পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত বাহিনী মোতায়েনের দাবি জানানো হয়। অনুপ্রবেশ, পাচার এবং অন্যান্য আন্তসীমান্ত অপরাধ ঠেকাতে এ দাবি জানায় সংগঠনগুলো।
এ ছাড়া ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবছর ধরে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) বাস্তবায়ন এবং উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপজেনকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের দাবি জানানো হয়। তাকে অপসারণ করা না হলে সরকারের পদত্যাগের আহ্বানও জানায় সংগঠনগুলো। নাগা সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নেমচা কিপজেনের স্বামী এবং কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্ট-প্রেসিডেন্সিয়াল গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান থাংবোই কিপজেন বেসামরিক নাগরিক হত্যার সঙ্গে জড়িত।
এদিকে কমিটি অন ট্রাইবাল ইউনিটি (কোটু) কাংপোকপিতে আলাদা সমাবেশ করেছে। নিখোঁজ দুই কুকি বেসামরিক নাগরিককে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলে সংগঠনটি জেলায় চলমান সর্বাত্মক ধর্মঘটের মেয়াদ আরও ২৪ ঘণ্টা বাড়িয়েছে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!