উৎসবের রঙে সাজছে...
আন্তর্জাতিক

জাপানের নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরুষ শিক্ষার্থী: একশ বছরের পরিচয় বদলাচ্ছে কেন?

জাপানের নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরুষ শিক্ষার্থী: একশ বছরের পরিচয় বদলাচ্ছে কেন?
লেখা বড়/ছোট করুন:

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, ক্যাম্পাস আর শিক্ষার্থীভর্তির নিয়ম বহু বছর ধরে তার পরিচয় তৈরি করে। সেই পরিচয় বদলানোর সিদ্ধান্ত তাই কেবল একটি প্রশাসনিক ঘোষণা নয়। জাপানের মুকোগাওয়া উইমেন্স ইউনিভার্সিটি জানিয়েছে, ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য ভর্তি চালু করবে এবং নাম হবে মুকোগাওয়া ইউনিভার্সিটি। যে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে এত দিন ‘উইমেন্স’ শব্দটি ছিল, সেখানে এই বদল স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে: শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন, নাকি উচ্চশিক্ষার ধারণাই পাল্টাচ্ছে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ঘোষণায় পরিবর্তনের পরিধি স্পষ্ট। তাদের তেরোটি অনুষদ ও একুশটি বিভাগে সহশিক্ষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে একই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত জুনিয়র ও সিনিয়র স্কুল মেয়েদের জন্যই থাকবে। অর্থাৎ খবরটি শুনে গোটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব স্তরে একই সঙ্গে নিয়ম বদলাচ্ছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। উচ্চশিক্ষার অংশে সিদ্ধান্তটি বড়; স্কুল পর্যায়ে তার সীমা আলাদা। পরিবর্তনের এই সুনির্দিষ্ট পরিসর জানলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা নিজেদের জন্য সিদ্ধান্তটির অর্থ ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।

কেন এই সময়? জাপানে তরুণ জনগোষ্ঠী কমে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি চাপ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে বড় প্রশ্ন। সম্ভাব্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষে ভর্তি, বিষয়ভিত্তিক পাঠদান এবং আর্থিক পরিকল্পনা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। মুকোগাওয়ার ঘোষণায় বৃহত্তর প্রবেশাধিকার ও বৈচিত্র্যের কথাও এসেছে। তাই সিদ্ধান্তটিকে শুধু আসন পূরণের কৌশল কিংবা শুধু সামাজিক আদর্শের পরিবর্তন হিসেবে দেখা অসম্পূর্ণ হবে। জনসংখ্যার পরিবর্তন, শিক্ষার্থীদের পছন্দ এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একসঙ্গে কাজ করছে।

এই বদলের সঙ্গে একটি সংবেদনশীল ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। নারীদের জন্য আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছিল এমন সময়ে, যখন উচ্চশিক্ষার অনেক দরজা তাদের জন্য পুরোপুরি খোলা ছিল না। সে ধরনের প্রতিষ্ঠান শিক্ষার সুযোগ, নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা ও নিরাপদ পরিসর গড়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে। এখন কোনো প্রতিষ্ঠান সহশিক্ষার পথ বেছে নিলে প্রশ্ন ওঠে, সেই ঐতিহ্যের কোন অংশ ধরে রাখা যাবে। নতুন ভর্তিনীতির পাশাপাশি নারীদের শিক্ষা ও নেতৃত্বে সহায়তা কীভাবে চলবে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ কাজেই বোঝা যাবে।

বিষয়টি কেবল মুকোগাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। টাইমস হায়ার এডুকেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জাপানের আরও কয়েকটি নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহশিক্ষার দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। তবে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের সময়সূচি ও সিদ্ধান্ত আলাদা। একটি ক্যাম্পাসের ঘোষণাকে গোটা দেশের সব নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই রায় হিসেবে পড়া যাবে না। কোথাও জনসংখ্যার চাপ বেশি, কোথাও শিক্ষার ধরন বা ঐতিহ্য আলাদা; তাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রাক্তনীদের অভিজ্ঞতাও আলাদা হবে।

বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো খুব বাস্তব। তারা যে পরিচয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন, ডিগ্রি বা ক্যাম্পাসজীবনে পরিবর্তন কীভাবে দেখা দেবে? নতুন শিক্ষার্থীদের আবাসন, সহায়ক পরিষেবা ও শিক্ষার পরিবেশ কীভাবে সাজানো হবে? বিশ্ববিদ্যালয় তার ঘোষণায় বিদ্যমান শিক্ষার্থীদের প্রতি সম্মান দেখানোর কথা বলেছে। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কীভাবে রূপ পায়, তা পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত নিয়ম ও শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা দেখে যাচাই করা যাবে। ঘোষণার একটি বাক্যই সব ব্যবহারিক প্রশ্নের উত্তর নয়।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও সতর্কতা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনিময় কর্মসূচির তথ্য বলছে, পুরুষ শিক্ষার্থীদের আবেদন সংক্রান্ত সুযোগ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু রূপান্তরের সময়ে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তাই ‘সব কোর্স এখন সবার জন্য খুলে গেছে’ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্দিষ্ট বিভাগ ও সেশনের নিয়ম দেখা জরুরি। একটি প্রতিষ্ঠানের নীতিগত বদল বাস্তব ভর্তি ব্যবস্থায় পৌঁছাতে সময় লাগে। এই সময়সূচি না বুঝলে সম্ভাব্য আবেদনকারী ভুল প্রত্যাশা তৈরি করতে পারেন।

শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্ন নামের পরিবর্তনের চেয়ে বড়: নতুন নিয়ম কি শিক্ষার সুযোগ বাড়াবে, আর নারীদের শিক্ষায় প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক অবদান কি নতুন রূপে টিকে থাকবে? উত্তর এখনই জানা সম্ভব নয়। ২০২৭ সালের ভর্তি, পাঠক্রম, সহায়ক ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা সেই উত্তর তৈরি করবে। তবে মুকোগাওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে দেখিয়েছে, জনসংখ্যা বদলালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুদিনের পরিচয়ও আলোচনার বাইরে থাকে না। ক্যাম্পাসের দরজা কার জন্য খুলছে, সেই সঙ্গে কী রক্ষা করা হচ্ছে—দুটিই দেখার বিষয়।

Sakir Mohammad

Sakir Mohammad

Graduate student in Journalism and Communication at Shanghai Jiao Tong University.

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!