ফ্রান্স থেকে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর চেষ্টার সময় প্রায় সব নারীই যাত্রাপথে ধর্ষণের শিকার হন বলে দাবি করেছেন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। তিনি বলেছেন, যুক্তরাজ্যে কারা প্রবেশ করবে তা মানবপাচারকারীরা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকলে আশ্রয়প্রার্থীদের যৌন নিপীড়নের ঝুঁকি থেকেই যাবে।
সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিকস’ পডকাস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাবানা মাহমুদ এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, উগ্র ডানপন্থি ও মুখোশধারী আন্দোলনকারীরা ক্ষমতায় এলে তাকে ‘হত্যা করবে’ অথবা ‘দেশ থেকে বের করে দেবে’।
সাবেক কনজারভেটিভ মন্ত্রী ররি স্টুয়ার্ট এবং টনি ব্লেয়ারের সাবেক ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেলের সঙ্গে আলোচনায় তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে কারা প্রবেশ করবে তা মানবপাচারকারীরা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকলে অধিকাংশ আশ্রয়প্রার্থীকেই যৌন নিপীড়নকারীদের শিকার হতে হবে। তিনি বলেন, ‘এই সীমান্তের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। উত্তর ফ্রান্সে এসে যারা ছোট নৌকায় ওঠার অপেক্ষায় থাকেন, তাদের বাছাই করে অপরাধী চক্রগুলো। আর তারাই আবার মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত।’
শাবানা মাহমুদ বলেন, ‘আপনি প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলতে পারেন, উত্তর ফ্রান্সে থাকা প্রত্যেক নারীই সম্ভবত এই যাত্রাপথে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। কিছু পুরুষও হয়েছেন। তারাও নিশ্চিতভাবেই নির্যাতন ও হুমকির শিকার হয়েছেন। কেউ যুক্তরাজ্যে আসতে পারবে কি না, দেশটিকে আশ্রয়ের স্থান হিসেবে বেছে নিতে পারবে কি না এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের সমাজের অংশ হবে কি না—এ ধরনের বিষয় নির্ধারণের মডেল এমন হওয়া উচিত নয়।’
অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল তাকে প্রশ্ন করেন, মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা বন্দর বন্ধ করে দিচ্ছে এবং তার নীতির প্রশংসা করছে—এ বিষয়ে তার মত কী। জবাবে শাবানা মাহমুদ বলেন, তাদের ‘দূর হয়ে যাওয়া উচিত’।
তিনি বলেন, ‘তারা শুধু ঝামেলা পাকায়। আপনারা জানেন, সুযোগ পেলে তারা এক মিনিটও দেরি না করে আমাকে হত্যা করবে এবং নিশ্চিতভাবেই আমাকে আমার নিজের দেশ থেকে বের করে দেবে। তাই তারা কারা এবং তাদের উদ্দেশ্য কী, সে বিষয়ে আমাদের পরিষ্কার থাকা উচিত। তারা মনে করে আমি প্রকৃত ব্রিটিশ নই এবং মুসলিম হওয়ায় তারা আমাকে ঘৃণা করে।’
শাবানা মাহমুদ আরও বলেন, তিনি নিজেকে ‘ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলনের অংশ’ মনে করেন। প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা কর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনাতেও তিনি ‘খুব অস্বস্তি’ বোধ করেছেন বলে জানান শাবানা।
সম্প্রতি লেবার পার্টির সম্মেলনে নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি সংগঠনের সমর্থনে কোনো সামগ্রী পরা বা বহনের সন্দেহে মার্সিসাইড পুলিশ ৮২ জনকে গ্রেপ্তার করে। মূলত ‘ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস’ আয়োজিত এক বিক্ষোভে লিভারপুলের সম্মেলনকেন্দ্রের বাইরে কয়েক ডজন মানুষ অবস্থান নেন। তাদের অনেকের হাতে ব্যানার ছিল, যেখানে তারা প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছিলেন।
শাবানা মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের মতো যারা দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনের পক্ষে আন্দোলন করে আসছি, তাদের জন্য বিষয়টি খুবই অস্বস্তিকর। এসব মানুষের অনেককে আমরা ব্যক্তিগতভাবে চিনি, তাদের সঙ্গে বিক্ষোভ মিছিলেও অংশ নিয়েছি। অথচ এখন তাদের সন্ত্রাসবাদ আইনের ১৩ নম্বর ধারায় অভিযুক্ত হতে দেখছি।’
তবে নিজের অবস্থানের সঙ্গে অস্বস্তি থাকলেও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পক্ষে অবস্থান নেন তিনি। শাবানা মাহমুদ বলেন, ‘আপনার নীতিগুলো প্রয়োগ করতে হবে, এমনকি তা আপনার জন্য অস্বস্তিকর হলেও।’
দ্য গার্ডিয়ান বলছে, রোববার (৪ অক্টোবর) ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের দিকে একটি অভিবাসীবাহী ছোট নৌকা এগিয়ে আসছিল। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণের তথ্য অনুযায়ী, ফরাসি কোস্টগার্ড ও উদ্ধারকারী নৌযানগুলো নৌকাটির গতিবিধি অনুসরণ করছিল। নৌকাটি ইংলিশ চ্যানেলের সীমারেখার দিকে এগোচ্ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, রোববার সকালে নৌকাটি নরম্যান্ডির উটাহ বিচ এলাকার কাছাকাছি কোনো স্থান থেকে যাত্রা শুরু করে।
ব্রিটিশ সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, ‘বর্ডার সিকিউরিটি কমান্ড সার্বক্ষণিক ইংলিশ চ্যানেলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং আমাদের সীমান্ত সুরক্ষায় কাজ করছে। প্রতিটি ছোট নৌকায় আসা ব্যক্তিকে আটক, যাচাই করা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
এদিকে রিফিউজি কাউন্সিলের পরিচালক ইমরান হুসেইন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যৌন সহিংসতার ব্যাপকতার বিষয়টি স্বীকার করাকে স্বাগত জানান। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আশ্রয়প্রার্থীরা যাতে নির্যাতনকারীদের হাতে না পড়েন, সে জন্য সহায়ক নিরাপদ ও বৈধ পথগুলো সরকার কেন বন্ধ করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সেবাগুলো থেকে আমরা জানি, যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা নারী ও মেয়েরা যে সংঘাত থেকে পালিয়ে এসেছেন, সেখানেও যৌন সহিংসতার শিকার হন। নিরাপত্তার সন্ধানে যে যাত্রা করতে বাধ্য হন, সেই পথেও তারা যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হন।’
তিনি বলেন, ‘এ কারণেই গত সপ্তাহে সরকার নতুন নিরাপদ পথ চালুর ঘোষণা দেয়াকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি আমরা বলেছিলাম, এসব পথ যেন মাত্র কয়েক শ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। গত বছর সরকার পরিবারকে পুনর্মিলনের সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। এটি ছিল শরণার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ পথ, যার সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতেন নারী ও শিশুরা।’
ইমরান হুসেইন বলেন, ‘এই যাত্রাপথে নারীরা যে বিপদের মুখোমুখি হন, সে বিষয়ে কথা বলা অবশ্যই সঠিক। কিন্তু একইসঙ্গে এমন নিরাপদ পথগুলো বন্ধ করা উচিত নয়, যেগুলো তাদের বিপদ থেকে দূরে রাখতে পারে। নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিরাপদ পথ বাড়াতে হবে, কমানো নয়।’
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!