আফ্রিকায় চলমান ইবোলা প্রাদুর্ভাবের খবরের মধ্যে একটি বিমানবন্দরের নাম নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে: উগান্ডার এন্তেব্বে। আফ্রিকান রোগনিয়ন্ত্রণ সংস্থার কর্মকর্তারা বলেছেন, নাইজেরিয়া ও কেনিয়ায় প্রথম শনাক্ত দুই রোগী ৩ অক্টোবর ওই বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছিলেন। তাঁরা পরস্পরের সংস্পর্শে এসেছিলেন কি না, তা এখন তদন্তের বিষয়। একই দিনে একই বিমানবন্দরে থাকা মানেই একজন আরেকজনকে সংক্রমিত করেছেন—এমন সিদ্ধান্তের কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশিত হয়নি। এই অনিশ্চয়তাই খবরটির কেন্দ্রীয় বিষয়, কারণ সংক্রমণের পথ না বুঝলে অন্য সম্ভাব্য সংস্পর্শ খুঁজে বের করাও কঠিন।
২২ অক্টোবর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে আফ্রিকা সিডিসির জরুরি প্রস্তুতি কর্মকর্তা ওয়েসাম মানকৌলার বক্তব্য এসেছে। তিনি জানান, দুই রোগীর মধ্যে বিমানবন্দরে কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ নিজেদের শনাক্ত সংস্পর্শগুলো অনুসরণ করছে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, আপাতত প্রথম রোগীর সংক্রমণ বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়েছে—এমন প্রমাণ নেই। এটিও সীমিত সময়ের পর্যবেক্ষণ; সংস্পর্শ অনুসরণ ও পরীক্ষা চলার সময় নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। স্বাস্থ্যসংকটে ‘এখনো প্রমাণ নেই’ আর ‘কখনো ঘটবে না’ এক কথা নয়।
কেনিয়ায় শনাক্ত রোগীর যাত্রাপথে কঙ্গোর সঙ্গে সংযোগ পাওয়া গেছে বলে আগের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল। পরে তাঁর পরিচিত সংস্পর্শদের মধ্যেও রোগ ধরা পড়েছে। অন্যদিকে নাইজেরিয়ায় শনাক্ত নারীর কঙ্গো সফরের তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পায়নি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। উগান্ডায় তাঁর ভ্রমণ নিয়ে বিভিন্ন বিবরণও যাচাই করা হচ্ছে। এই দুই পরিস্থিতি আলাদা। এক দেশের সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে যা জানা গেছে, তা আরেক দেশের রোগীর ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যায় না। তদন্তকারীদের কাজ হলো ভ্রমণের নির্ভরযোগ্য সময়রেখা, সংস্পর্শের তালিকা ও পরীক্ষার ফল একত্র করা।
প্রাদুর্ভাবটি কঙ্গোতে মে মাসে শনাক্ত হওয়ার পর সীমানা পেরিয়েছে। এপির তথ্য অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর পর্যন্ত কঙ্গোতে সাড়ে নয় হাজারের বেশি সংক্রমণ এবং প্রায় অর্ধেকের মৃত্যু হয়েছে। এই সংখ্যা দ্রুত বদলাতে পারে, তাই প্রকাশের তারিখ উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ। এবারের প্রাদুর্ভাব বিরল বুন্ডিবুগিও ভাইরাসের সঙ্গে যুক্ত; এটির জন্য অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই বলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এর অর্থ রোগীর যত্নের মূল্য কম নয়। দ্রুত শনাক্তকরণ, নিরাপদ চিকিৎসা, সুরক্ষাসামগ্রী এবং সংস্পর্শ অনুসরণ এখনো প্রাণ বাঁচানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
বিমানবন্দর নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আতঙ্কে সব যাত্রীকে সন্দেহ করা সহজ। কিন্তু ইবোলা সাধারণ সর্দির মতো বাতাসে দূর থেকে ছড়ায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমিত ব্যক্তির রক্ত বা অন্যান্য শারীরিক তরলের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ, কিংবা সেগুলো লেগে থাকা উপকরণের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটে। উপসর্গ, সংস্পর্শের ধরন এবং সময়রেখা একসঙ্গে বিচার করতে হয়। কোনো দেশের নাগরিকত্ব বা শুধু একটি যাত্রাপথ কাউকে রোগী বলে চিহ্নিত করে না। তাই গুজব ছড়িয়ে মানুষকে দোষারোপ করার বদলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের যাচাই করা নির্দেশনা অনুসরণ জরুরি।
কঙ্গোর বাইরে রোগ শনাক্ত হওয়ায় সীমান্ত পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব বেড়েছে। প্রথম রোগী শনাক্ত হতে দেরি হলে হাসপাতালের কর্মী, পরিবারের সদস্য এবং সহযাত্রীদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়। আবার ভালো অনুসন্ধানের ফলে পরিচিত সংস্পর্শকে দ্রুত নজরদারিতে আনা গেলে ছড়ানো ঠেকানোর সুযোগ থাকে। নাইজেরিয়া ও কেনিয়ার ঘটনায় কর্মকর্তারা সেই কাজই করছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সমন্বিত প্রস্তুতির কথা বলছে, কারণ মানুষ চিকিৎসা, কাজ বা পরিবারের কারণে সীমান্ত পেরোন। এক দেশের তথ্য অন্য দেশের দলে সময়মতো পৌঁছানো তাই জরুরি।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে সৎ উত্তর হলো: এন্তেব্বেতে দুই রোগী ছিলেন বলে জানা গেছে, কিন্তু তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ বা সংক্রমণ ঘটেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরবর্তী তথ্য এই ধারণা বদলাতে পারে। খবরটি পড়ার সময় তাই রহস্যের উত্তেজনা আর প্রমাণের সীমা আলাদা রাখা দরকার। জনস্বাস্থ্যে দ্রুত সতর্কতা জরুরি; একই সঙ্গে ভুল নিশ্চিতকরণ মানুষকে অকারণে ভয় দেখাতে পারে এবং প্রকৃত তদন্তকে আড়াল করতে পারে।
যাঁরা আক্রান্ত অঞ্চলে থাকেন, তাঁদের জন্য স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্দেশই প্রধান। জ্বর বা অন্য উপসর্গের সঙ্গে সম্ভাব্য সংস্পর্শের ইতিহাস থাকলে দ্রুত স্বাস্থ্যকর্মীকে জানানো দরকার, কিন্তু নিজের অনুমানে রোগ নির্ণয় করা উচিত নয়। একইভাবে অনলাইনে ছড়ানো অযাচাই নাম বা যাত্রীর ছবি শেয়ার করলে ব্যক্তির ক্ষতি হতে পারে, অথচ সংক্রমণ অনুসন্ধানে তা সাহায্য করে না।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!