উৎসবের রঙে সাজছে...
আন্তর্জাতিক

চীনের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠাল ফিলিপাইন: কয়েকটি কথায় দক্ষিণ চীন সাগরে কী বদলাল?

চীনের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠাল ফিলিপাইন: কয়েকটি কথায় দক্ষিণ চীন সাগরে কী বদলাল?
লেখা বড়/ছোট করুন:

দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধে জাহাজের চলাচল ও সমুদ্রসীমা নিয়ে উত্তেজনা নতুন নয়। কিন্তু এবার কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একটি মন্তব্য। ফিলিপাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৯ অক্টোবর চীনের রাষ্ট্রদূত জিং ছুয়ানকে ডেকে পাঠিয়েছে। ম্যানিলার বক্তব্য, তাঁর আগের মন্তব্য শক্তি প্রয়োগের হুমকির ইঙ্গিত দেয় এবং ফিলিপাইনের সরকারি কর্মকর্তাদের সমালোচনা থামাতে ভয় দেখানোর চেষ্টা বলে মনে হয়েছে। বেইজিং বলেছে, ফিলিপাইনের প্রতিক্রিয়া অতিরঞ্জিত। দুই পক্ষের এই ভিন্ন ব্যাখ্যাই খবরটির মূল বিষয়।

ঘটনার সূত্র কয়েক দিন আগের এক সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নোত্তর। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী চীনকে আঞ্চলিক সমস্যার কারণ বলার পর রাষ্ট্রদূত সেই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর তিনি বলেন, চীন শক্তি ব্যবহার করতে চাইলে সহজেই জিততে পারত, তবে সে পথ বেছে নেবে না এবং শান্তি চায়। একই বাক্যের শেষ অংশে শান্তির কথা থাকলেও প্রথম অংশকে ম্যানিলা সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এমন মন্তব্যের গুরুত্ব শুধু শব্দে নয়; সীমান্ত বা জলসীমা নিয়ে আগে থেকেই চলা অবিশ্বাসের মধ্যেও তা মূল্যায়িত হয়।

ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মা থেরেসা লাজারো রাষ্ট্রদূতকে জানান, এই বক্তব্য উসকানিমূলক ও অগ্রহণযোগ্য বলে তাঁর সরকার মনে করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে মত প্রকাশের অধিকার আছে এবং বিদেশি দূতের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা মেনে নেওয়া যায় না। ম্যানিলা প্রয়োজন হলে আরও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রাখার কথাও জানিয়েছে। তবে রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠানো আর তাঁকে বহিষ্কার করা এক ঘটনা নয়; দ্বিতীয়টি ঘটেছে বলে কোনো তথ্য নেই।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৯ অক্টোবরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র মাও নিং অন্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কিছু ফিলিপিনো রাজনীতিক চীনকে উদ্দেশ করে দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলছেন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষতি করছেন। তিনি ফিলিপাইনকে সেসব বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান। চীনা সরকারি প্রতিক্রিয়া পড়লে বোঝা যায়, বেইজিং মূল দায় তার রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যে দেখছে না; বরং ম্যানিলার ভেতর থেকে আসা সমালোচনাকে সমস্যা হিসেবে দেখছে। একই কূটনৈতিক ঘটনার দুই বিপরীত পাঠ সংবাদ পাঠকের সামনে রাখা জরুরি।

এই বিরোধের পটভূমি সমুদ্রসীমা নিয়ে দীর্ঘদিনের মতভেদ। দক্ষিণ চীন সাগরের বিস্তীর্ণ অংশে চীন দাবি করে; ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশেরও নিজস্ব দাবি আছে। সমুদ্রপথটি বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে সমুদ্রে জাহাজের মুখোমুখি হওয়া এবং সরকারগুলোর কথার সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করেছে। তাই সংবাদ সম্মেলনের একটি বাক্যও দ্রুত রাষ্ট্রীয় প্রতিবাদের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তবে আজকের কূটনৈতিক প্রতিবাদকে নতুন সামরিক সংঘর্ষের খবর হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

কূটনৈতিক ভাষা সাধারণত হিসাব করে ব্যবহার করা হয়। কোনো রাষ্ট্রদূতের কথা অন্য দেশের রাজধানীতে কী অর্থে শোনা হবে, সেটি তাঁর উদ্দেশ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। চীনা দূতের সমর্থকেরা হয়তো বলবেন, তিনি শক্তি ব্যবহার না করার কথাই বলেছেন। ফিলিপাইনের কর্মকর্তারা পাল্টা বলছেন, আগে শক্তির তুলনা টেনে পরে শান্তির কথা বলা ভয় কমায় না। এই বিতর্কে কোনো পক্ষের শব্দ বাদ দিলে ঘটনার অর্থ পাল্টে যায়। তাই পুরো বক্তব্য ও উভয় সরকারের প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে জানা প্রয়োজন।

আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের জন্যও প্রশ্ন আছে। উত্তেজনা বাড়লে মাছ ধরা, জাহাজ চলাচল বা আলোচনার পরিবেশে প্রভাব পড়তে পারে। আবার কূটনৈতিক প্রতিবাদ অনেক সময় সংঘাতের বদলে অসন্তোষ জানানোর নিয়মতান্ত্রিক পথ। তাই রাষ্ট্রদূতকে তলব করা মানেই পরবর্তী ধাপ অনিবার্য সংঘর্ষ—এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না। দুই দেশের পরবর্তী বৈঠক, বিবৃতি এবং সমুদ্রের বাস্তব পরিস্থিতি দেখে বোঝা যাবে উত্তেজনা কমছে, না বাড়ছে।

এই মুহূর্তে নিশ্চিত তথ্য সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ: ফিলিপাইন দূতকে ডেকেছে, মন্তব্যের আপত্তি জানিয়েছে এবং চীন তার অবস্থান সমর্থন করেছে। সবচেয়ে বড় অজানা প্রশ্ন, পরের কথাগুলো কীভাবে বলা হবে। দক্ষিণ চীন সাগরে যেখানে জাহাজের দূরত্ব কখনো খুব কম, সেখানে দুই রাজধানীর ভাষার দূরত্বও নিরাপত্তার হিসাব বদলে দিতে পারে। কয়েকটি বাক্য তাই কেবল বাক্য নয়; বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার বা আরও ক্ষয় করার পরীক্ষা।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!