রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে ডিজেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে মস্কোর সঙ্গে আলোচনার পর রুশ ডিজেল আমদানিতে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে তার প্রশাসন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই উদ্যোগে ডিজেলের দাম দীর্ঘমেয়াদে কম থাকবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ট্রাম্প জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার ‘অত্যন্ত সফল’ আলোচনা হয়েছে। এ আলোচনায় রাশিয়া অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাজারে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে। এই পরিমাণ প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল জ্বালানির সমান। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করে।
ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ঘোষণার পর ডিজেলের দাম কমতে শুরু করে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে সরবরাহ বাড়াতে এই চুক্তির প্রভাব সীমিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে কৃষিকাজ, ঘরবাড়ি গরম রাখা এবং পণ্য পরিবহনের ট্রাকে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বর্তমানে জ্বালানিটির দাম রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনে কংগ্রেসে নিজেদের সামান্য ব্যবধানে থাকা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চান ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের নেতারা। জ্বালানির উচ্চমূল্য তাদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার পর পুতিনের দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সহযোগিতার প্রশংসা করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত মাসে ওয়াশিংটন সফরের সময় দিমিত্রিয়েভ যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার জন্য রাশিয়ার প্রধান তেল কোম্পানিগুলোর পক্ষে মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে আবেদন করেছিলেন।
ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে ২০২৫ সালের অক্টোবরে দেশটির তেল কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এসব নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ছিল মস্কোর রাজস্ব কমিয়ে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল করা। এখন ডিজেল রপ্তানির সুযোগ পেলে রাশিয়া কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পুতিনকে সহায়তা করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির অনুমতি দিয়ে একটি লাইসেন্স জারি করেছে। এই অনুমতির মেয়াদ আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত।
ট্রাম্প আরও জানিয়েছেন, নভেম্বরে রাশিয়া অতিরিক্ত ৫ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপরপরই আরও ১০ লাখ টন সরবরাহ করা হবে। রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারগুলোর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পরবর্তী সময়ে সরবরাহ আরও বাড়ানো হতে পারে। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। যুদ্ধের অবসানের উপায় নিয়ে আলোচনা করতে ইউক্রেনের একটি প্রতিনিধিদল যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার সময় চুক্তিটি ঘোষণা করা হয়।
জেলেনস্কি এক্সে লিখেছেন, ‘শক্তিশালী অংশীদারদের এমন দুর্বল সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।’ তার মতে, পুতিনকে এ ধরনের সুবিধা দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, ‘পুতিনকে উপহার দিলে শান্তি আসবে না, সভ্য বিশ্বেরও কোনো উপকার হবে না। রাশিয়া ডিজেলের বিনিময়ে আরও সন্ত্রাস ও বিশ্বাসঘাতকতা ফিরিয়ে দেবে।’
ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। প্রতিনিধি ডন বেকন বলেন, সম্প্রতি কংগ্রেসে পাস হওয়া নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সময় এসেছে, সেগুলো তুলে নেওয়ার নয়।
বেকন এক্সে লেখেন, ‘পুতিনের যুদ্ধযন্ত্রকে চাপে ফেলতে এখনই ওই নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করা উচিত। ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার সময় একজন স্বৈরশাসকের হাতে আরও অর্থ তুলে দিয়ে তাকে পুরস্কৃত করা উচিত নয়।’
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ফলে ডিজেলের দাম দীর্ঘ সময়ের জন্য কমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তেলবাজার গবেষক এবং কমোডিটি কনটেক্সটের প্রতিষ্ঠাতা ররি জনস্টন এক্সে লিখেছেন, এই চুক্তির প্রভাব কার্যত খুবই সামান্য।
তার মতে, রাশিয়ার শোধনাগারগুলো ইউক্রেনের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত না হলে দেশটি সাধারণত চুক্তিতে উল্লেখ করা পরিমাণের তুলনায় অনেক বেশি ডিজেল রপ্তানি করে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষক জিম মিচেল বলেন, এটি স্পষ্টতই সমস্যার সমাধান নয়; বরং অত্যন্ত সংকুচিত ডিজেল বাজারে সরবরাহের আরেকটি উৎস যোগ করার উদ্যোগ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ৭০ শতাংশ বেড়েছে। ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে।
মার্কিন মোটরচালক সংগঠন এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৬ দশমিক ২৮ ডলারে পৌঁছায়। সরবরাহ বাড়াতে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া আগের দুটি পদক্ষেপের পরও দাম উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে মিত্রদেশগুলোকে জরুরি জ্বালানি মজুত বাজারে ছাড়তে চাপ দেওয়া এবং কৃষিযন্ত্রে ব্যবহৃত করমুক্ত রঙিন ডিজেলের প্রাপ্যতা বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।
নতুন চুক্তির খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের ফিউচার মূল্য প্রায় ৫ শতাংশ কমে প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ৬৪ ডলারে নেমে আসে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমেরিকানদের জন্য, বিশেষ করে আমাদের মহান কৃষক, পশুপালক ও ট্রাকচালকদের জন্য দাম কমানোই আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
এদিকে ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সরকারি বিভাগের প্রধানদের নির্দেশ দিতে পারেন বলে শুক্রবার জানিয়েছেন শিল্প খাতের তিনটি সূত্র। এ নির্দেশ প্রেসিডেন্টের স্মারকলিপি আকারে জারি হতে পারে।
সূত্রগুলোর মতে, স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের যেসব বিধিনিষেধ জ্বালানি উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করছে, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি তেল ও জ্বালানির উৎপাদন বাড়াতে শীতল যুদ্ধের সময়কার ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
এই আইনের আওতায় প্রেসিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে সরকারি সমর্থনযুক্ত ঋণ বা ঋণের নিশ্চয়তা দেওয়ার অনুমোদন দিতে পারেন। পাশাপাশি জরুরি পণ্য সরবরাহে সরকারি চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে তার।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি সামনে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের শোধনক্ষমতা বাড়াতে এই আইন কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে হোয়াইট হাউস আলোচনা করছে।
তবে গত মাসে মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তেল শোধনাগার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীরা বলেছেন, নতুন শোধনাগার নির্মাণের চেয়ে বিদ্যমান শোধনাগারগুলোর দক্ষতা বাড়ানো বা সেগুলোর সম্প্রসারণে সরকারি অর্থ ব্যয় করা বেশি কার্যকর হবে। নতুন শোধনাগার নির্মাণে খরচ বেশি এবং তা সম্পন্ন করতেও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!