ভূমিকম্পের প্রথম খবর আসে কাঁপুনি, ধ্বংস আর হতাহতের সংখ্যা নিয়ে। কয়েক দিন পরে অন্য প্রশ্নগুলো সামনে আসে: ঘর হারানো মানুষ কোথায় ঘুমাবেন, পানির নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, আর ঠান্ডা আবহাওয়ায় চিকিৎসা পৌঁছাবে কীভাবে? চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নাগছু এলাকার বাকেন কাউন্টিতে ২২ অক্টোবরের শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর এখন সেই দ্বিতীয় ধাপের কাজ চলছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে ২৫ অক্টোবর চীনা সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, উদ্ধার ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি রোগ নজরদারি, পানির পরীক্ষা এবং অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র চালু রাখা হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, ধ্বংসস্তূপ সরানোই দুর্যোগ মোকাবিলার শেষ কাজ নয়।
২২ অক্টোবর রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে স্থানীয় সময় ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সিনহুয়ার প্রকাশিত হিসাবে ১৬ জন নিহত ও ৭৬ জন আহত হয়েছেন; ১২ হাজারের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এসব সংখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তখনকার তথ্য, পরবর্তী প্রতিবেদনে বদলাতে পারে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শত শত ঘর ভেঙে পড়েছে। দুর্গম ভূপ্রকৃতি, রাস্তার সমস্যা এবং ঠান্ডা আবহাওয়া উদ্ধারকাজ কঠিন করেছে। একজনের জন্য ত্রাণ পৌঁছানো মানে কেবল খাবার দেওয়া নয়; আশ্রয়, ওষুধ, পানি, শৌচাগার এবং যোগাযোগের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
নাগছুর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চার হাজার আটশ মিটার উঁচুতে। অক্টোবরের শেষেই সেখানে তাপমাত্রা কম থাকে। অস্থায়ী তাঁবুতে উষ্ণতার ব্যবস্থা না থাকলে বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তির জন্য ঝুঁকি বাড়তে পারে। সিনহুয়ার বিবরণে দেখা যায়, শীত মোকাবিলায় তাঁবুর ভেতরে চুলা বসানো হয়েছে। তবে কতটি আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত গরমের ব্যবস্থা আছে, তার পূর্ণ স্বাধীন মূল্যায়ন প্রকাশিত হয়নি। কয়েকটি ভালো উদাহরণ পুরো এলাকার অবস্থার বিকল্প নয়। এই সীমাটি মাথায় রেখেই ত্রাণের অগ্রগতি পড়তে হবে।
পানির বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। পাইপলাইন, সংরক্ষণপাত্র বা শৌচব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা তৈরি হয়। নাগছুর ভূমিকম্প ত্রাণ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোগ নিয়ন্ত্রণ দল ৩৫টি পুনর্বাসন স্থানে তিন হাজার ছয়শর বেশি মানুষের স্বাস্থ্য নজরদারি করেছে। জনসমাগমের জায়গা জীবাণুমুক্ত করা এবং পানির নিরাপত্তা পরীক্ষাও চলছে। এর অর্থ কোনো নির্দিষ্ট সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়েছে, তা নয়; সম্ভাব্য ঝুঁকি ঠেকাতে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুর্যোগ সংবাদে এই পার্থক্য পরিষ্কার রাখা জরুরি।
অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে চলমান চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে বলে সিনহুয়া জানিয়েছে। সেখানে সাধারণ অসুস্থতা ও ছোটখাটো আঘাতের চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ এবং প্রাথমিক মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। একটি এলাকায় আহত নারীকে চিকিৎসক দ্রুত সেবা দিয়েছেন, আর গর্ভবতী একজন নারীর মৌলিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে—এমন উদাহরণও প্রতিবেদনে আছে। এগুলো বাস্তব সেবার ছবি দেয়, তবে সবার প্রয়োজন পূরণ হয়েছে কি না তা বোঝার জন্য আরও বিস্তৃত তথ্য দরকার। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধ, প্রসূতি সেবা এবং আহতদের পরবর্তী চিকিৎসা কয়েক দিন পরেও গুরুত্বপূর্ণ থাকে।
সিনহুয়া জানিয়েছে, অস্থায়ী রান্নাঘর, পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং পরিবেশবান্ধব শৌচাগারের মতো সরঞ্জামের প্রথম চালান ব্যবহার শুরু হয়েছে। এগুলো শুধু আরাম বাড়ানোর জিনিস নয়। নিরাপদ রান্না ও পানি বড় জমায়েতে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। তবু সরঞ্জাম পৌঁছানো আর নিয়মিত চালু রাখা আলাদা কাজ। জ্বালানি, পরিষ্কার পানি, যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই সুবিধা কমে যেতে পারে। তাই পুনর্বাসনের গুণমান বিচার করতে দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে।
এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, সরিয়ে নেওয়া পরিবারগুলো কত দিন অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর নিরাপদ পুনর্নির্মাণ কীভাবে হবে। নতুন কম্পন, আবহাওয়া ও যোগাযোগ পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী উদ্ধার, স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসনের কাজ চলছে; কিন্তু সব পরিবার নিরাপদে ফিরেছে বলা যাবে না। এই ভূমিকম্প মনে করিয়ে দিচ্ছে, দুর্যোগের প্রকৃত গল্প প্রথম দিনের মৃত্যুসংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না। পরবর্তী সপ্তাহগুলোর পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসার মানই বহু মানুষের জীবন নির্ধারণ করবে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!