চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এত দিন অনেকের চোখে ছিল উন্নত চিপ, যন্ত্রপাতি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের গল্প। এখন নজর পড়ছে বিনিয়োগের টাকার দিকেও। ২২ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় এমন একটি প্রস্তাবিত নিয়ম সামনে এনেছে, যা চীনসহ নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে মার্কিন বিনিয়োগের ওপর আরও নজরদারি ও সীমা আরোপ করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি ‘প্রস্তাবিত’। জনমত গ্রহণ ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের আগে এটিকে কার্যকর চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা বলা যাবে না। তবু প্রস্তাবটি বোঝায়, শুধু প্রযুক্তি কোথায় বিক্রি হচ্ছে নয়, প্রযুক্তি গড়ার পুঁজি কোথা থেকে আসছে, সেটিও এখন নীতিনির্ধারকদের বড় প্রশ্ন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, নতুন খসড়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সুপারকম্পিউটিং, জৈবপ্রযুক্তি এবং অতিদ্রুতগতির অস্ত্রব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত করার কথা আছে। চীনের পাশাপাশি রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, ইরান ও কিউবার মতো দেশও আলোচনায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হলো, বেসরকারি পুঁজি এমন সামর্থ্য গড়তে সাহায্য করতে পারে, যার সামরিক ব্যবহার সম্ভব। এই যুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ব্যবসায়িক মহলে দ্বিমত থাকতে পারে; কিন্তু প্রস্তাবটি প্রকাশিত হওয়া নিজেই একটি নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
প্রস্তাবের সীমাও আছে। এপি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ হাজার ডলারের বেশি নির্দিষ্ট বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই নিয়মটি প্রযোজ্য হওয়ার কথা। শেয়ারবাজারে সাধারণ শেয়ার কেনার মতো অনেক আর্থিক লেনদেন ব্যতিক্রমের মধ্যে থাকতে পারে। তাই ‘চীনে সব মার্কিন টাকা বন্ধ’—এমন শিরোনাম ভুল ধারণা দেবে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কোন লেনদেনকে সংবেদনশীল প্রযুক্তি তৈরিতে সহায়ক হিসেবে ধরা হবে, কোনটিতে আগাম জানানো লাগবে, আর কোনটিতে নিষেধাজ্ঞা আসবে। চূড়ান্ত ভাষা না বের হওয়া পর্যন্ত এসবের পরিসর বদলাতে পারে।
এই উদ্যোগের পেছনে আগের ইতিহাসও আছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে চীনে সেমিকন্ডাক্টর, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও এআই-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট বিনিয়োগে নিয়ন্ত্রণের পথ শুরু হয়। পরে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় বিদেশমুখী বিনিয়োগ নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করে। ২০২৫ সালের একটি আইন সেই কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করার নির্দেশ দেয়। নতুন প্রস্তাব তাই শূন্য থেকে আসেনি; এটি কয়েক বছরের ধারাবাহিক নীতির পরবর্তী ধাপ। পুরোনো নিয়ম আর নতুন খসড়াকে এক করে দেখলে কোন পরিবর্তনটি সত্যিই নতুন, তা বোঝা কঠিন হবে।
চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ? একটি কোম্পানি শুধু অর্থের জন্য বিনিয়োগ নেয় না। বিনিয়োগকারীর সঙ্গে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বাজারে প্রবেশের সুযোগ, পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগও আসতে পারে। মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা ঠিক এই অতিরিক্ত সহায়তা নিয়েই উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে চীনের গবেষণা ও ব্যবসায়িক খাতের কাছে এমন বিধিনিষেধ অর্থ জোগাড় ও সহযোগিতা কঠিন করতে পারে। প্রভাব অবশ্য সব প্রতিষ্ঠানে সমান হবে না। স্থানীয় তহবিল, অন্য দেশের পুঁজি ও নিজস্ব গবেষণার শক্তি প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা।
প্রস্তাবটি আরও একটি দ্বন্দ্ব দেখায়। দুই বৃহৎ অর্থনীতি বাণিজ্য ও গবেষণায় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, অথচ নিরাপত্তা নিয়ে তাদের অবিশ্বাস বাড়ছে। যেসব ক্ষেত্রে চিকিৎসা বা বেসামরিক ব্যবহারও সম্ভব, যেমন জৈবপ্রযুক্তি, সেখানে কোন প্রকল্পকে সংবেদনশীল বলা হবে, সেই সিদ্ধান্ত আরও কঠিন। খুব বিস্তৃত নিয়ম উদ্ভাবন কমাতে পারে, আবার খুব সংকীর্ণ নিয়ম নিরাপত্তা লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হতে পারে। জনমত গ্রহণের পর খসড়া কতটা বদলায়, সেটিই তাই দেখার বিষয়।
আজকের খবরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ঘোষণার নাটকীয় শব্দের চেয়ে নিয়মের সীমানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোন প্রযুক্তি, কোন দেশের কোন প্রতিষ্ঠান, কত অর্থের কোন ধরনের লেনদেন—এসব প্রশ্নের উত্তরেই বাস্তব প্রভাব লুকিয়ে আছে। ওয়াশিংটন এখন মতামত শুনবে, তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। সেই সিদ্ধান্তের আগে চীন-মার্কিন প্রযুক্তি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়ার চেয়ে প্রস্তাবের ভাষা ও সম্ভাব্য ব্যতিক্রম নজরে রাখা বেশি সঠিক।
বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের জন্য পরবর্তী ধাপ হবে প্রকাশিত খসড়ার নির্দিষ্ট সংজ্ঞা পড়া। একই প্রযুক্তির বেসামরিক ও সামরিক ব্যবহার থাকতে পারে; তাই শুধু খাতের নাম দেখে সব চুক্তির পরিণতি বোঝা যায় না। কোন প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কোথায়, বিনিয়োগের পরিমাণ কত এবং বিনিয়োগের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহায়তা আছে কি না—এসব তথ্য বাস্তব সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!