সেতুটি দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু চলাচল শুরু হয়নি। চীনের দানদং শহর ও উত্তর কোরিয়ার সিনুইজুকে যুক্ত করা নতুন ইয়ালু নদী সেতু বহু বছর এমন অবস্থাতেই ছিল। অবশেষে বৃহস্পতিবার দুই দেশের কর্মকর্তারা এর উদ্বোধন করেছেন। প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ, চার লেনের এই পথ খুলে যাওয়ায় সীমান্ত বাণিজ্য ও যাতায়াতের নতুন সুযোগ তৈরি হলো। তবে একটি সেতু চালু হওয়া আর তার ওপর দিয়ে নিয়মিত কত মানুষ ও পণ্য যাবে—দুটি বিষয় এক নয়। তাই উদ্বোধনের খবরের পাশাপাশি এখন নজর থাকবে বাস্তব চলাচলের দিকে।
সেতুটি ২০১৪ সালের দিকে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা ছিল। চীনের দিকের কাজ অনেক আগেই শেষ হলেও উত্তর কোরিয়ার দিকে প্রয়োজনীয় সংযোগ ও অবকাঠামোর কাজ দীর্ঘদিন অসম্পূর্ণ ছিল বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে। কেন এত বিলম্ব হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা ব্যাখ্যা ও জল্পনা ছিল। কিন্তু সব কারণ নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। যেটি নিশ্চিত, তা হলো সীমান্তে একটি দৃশ্যমান অবকাঠামো এক দশকেরও বেশি সময় পুরো উদ্দেশ্যে কাজে লাগেনি। এত বড় প্রকল্পে নির্মাণের পাশাপাশি অপর পাশের প্রস্তুতি, অনুমতি ও কার্যকর পরিচালনা কতটা জরুরি, এই ঘটনাই তার উদাহরণ।
উদ্বোধনে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং এবং উত্তর কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী পাক থে সং ভিডিও বার্তায় দুই দেশের যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর আশা প্রকাশ করেছেন। দুই দেশের কর্মকর্তারা ফিতা কেটেছেন। এসব আনুষ্ঠানিক বার্তা কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি চিত্র দেখায়, কিন্তু অর্থনৈতিক ফল বোঝার জন্য আরও সময় লাগবে। নতুন সেতু দিয়ে কত ট্রাক যাবে, কোন পণ্য আসবে বা যাবে, সীমান্তে কী নিয়ম প্রয়োগ হবে এবং তা কতটা নিয়মিত থাকবে—এসব তথ্যই ভবিষ্যতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এই সীমান্তে আগেও একটি পরিচিত সেতু ছিল, যা দানদং ও সিনুইজুর মধ্যে রেল ও সড়ক যোগাযোগে ব্যবহৃত হয়। পুরোনো পথে গাড়ি চলাচলের সীমাবদ্ধতা আছে এবং সেটির ওপর দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের বড় অংশ নির্ভর করে বলে এপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন চার লেনের সড়কসেতু সেই চাপ কমাতে পারে। দীর্ঘ লাইনের বদলে দ্রুত পারাপার সম্ভব হলে পরিবহনের খরচ ও সময়ের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তবে ‘পারে’ শব্দটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ: সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, শুল্ক পরীক্ষা এবং দুই পক্ষের নীতির ওপর বাস্তব ফল নির্ভর করবে।
চীন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। তাই সীমান্তে নতুন পথ চালু হওয়ার খবর কেবল স্থানীয় পরিবহন প্রকল্পের খবর নয়; এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বিষয় রয়েছে। নতুন পথ দিয়ে চলাচল বাড়লে নিয়ম মেনে পণ্য আদানপ্রদান হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয় হবে। শুধু সেতুর ছবি দেখে বাণিজ্য কতটা বেড়েছে কিংবা নিষেধাজ্ঞা কীভাবে প্রভাবিত হবে—এমন সিদ্ধান্ত টানা সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার যোগাযোগও বেড়েছে। নতুন ইয়ালু সেতু চালুর প্রায় এক মাস আগে রাশিয়া–উত্তর কোরিয়া সড়কসেতু খুলেছে বলে এপি জানিয়েছে। ফলে চীনের সঙ্গে নতুন সংযোগের সময়টিও আঞ্চলিক সম্পর্কের আলোচনায় এসেছে। তবে কোনো একটি প্রকল্পকে দুই দেশের সব কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রমাণ ভাবা উচিত নয়। রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক বার্তা, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং সীমান্তের দৈনন্দিন কাজ—এগুলো আলাদা স্তরে চলতে পারে।
দানদংয়ের ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী কিংবা সীমান্তপারের পরিবারের কাছে সবচেয়ে বাস্তব প্রশ্ন হয়তো আরও সহজ: নতুন পথ ব্যবহার করা যাবে কত সহজে? নিয়মিত ট্রাক চলবে কি, অপেক্ষার সময় কমবে কি, মানুষের যাতায়াতের সুযোগ কতটা থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর উদ্বোধনের বক্তৃতায় পাওয়া যায় না। আগামী সপ্তাহ ও মাসের চলাচলের তথ্য, সীমান্তের নিয়ম এবং ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা থেকে তা বোঝা যাবে। বারো বছরের অপেক্ষা শেষ হয়েছে; এখন শুরু হলো সেতুটি সত্যিই কতটা কাজে লাগবে, সেই পরীক্ষা।
অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে বড় ঘোষণা এলে উদ্বোধনের দিনটিই সাধারণত শিরোনামে থাকে। কিন্তু সাফল্যের হিসাব তৈরি হয় পরে: কত দিন পথ খোলা থাকল, কতটা নিরাপদে চলাচল হলো, আর স্থানীয় মানুষ তার সুবিধা পেলেন কি না। নতুন ইয়ালু সেতুর ক্ষেত্রেও একই মাপকাঠি প্রযোজ্য। এটিকে বড় কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখার আগে সীমান্তের নিয়মিত তথ্যের অপেক্ষা করাই হবে বেশি সতর্ক সিদ্ধান্ত।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!