একটি চ্যাটবটকে যদি কেউ জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করে, উত্তরটি শুধু দ্রুত হলেই চলে না। কোন পরামর্শ নিরাপদ, কোনটি পক্ষপাতদুষ্ট, আর মতভেদ হলে কার মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হবে—এসব প্রশ্নও সামনে আসে। সেই কারণেই বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ধর্মীয় নেতা, দার্শনিক ও নীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলছে। কিন্তু ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে কয়েকটি নিয়ম তুলে নিয়ে সফটওয়্যারে বসালেই কি একটি এআই ‘ভালো’ হয়ে যায়? ২৫ অক্টোবর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে এই প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ঘটনাটির গুরুত্ব প্রযুক্তির চেয়ে বিস্তৃত: লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে কথা বলা একটি ব্যবস্থা কোন ধরনের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বহন করবে, তা কে ঠিক করবে?
এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক মে মাসে প্রকাশিত নিজস্ব বিবরণে জানিয়েছিল, তারা পনেরটির বেশি ধর্মীয় ও আন্তসাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর পণ্ডিত, যাজক, দার্শনিক এবং নীতিবিদদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্দেশ্য কোনো একটি ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি চ্যাটবটে চাপিয়ে দেওয়া নয়। তারা নানা মতের মানুষের কাছ থেকে জানতে চায় ভালো চরিত্র, দায়িত্বশীল আচরণ এবং কঠিন পরিস্থিতিতে নীতি ধরে রাখার অর্থ কী। এসব আলোচনা তাদের ক্লড নামের এআই ব্যবস্থার আচরণ নির্দেশিকা ও মূল্যায়নে কাজে লাগতে পারে। ‘কাজে লাগতে পারে’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ; প্রতিষ্ঠানটি প্রতিটি আলোচনার ফলে ঠিক কোন পরিবর্তন হয়েছে, তার পূর্ণ প্রকাশ্য তালিকা দেয়নি।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এআইয়ের নিরাপত্তা বোঝাতে পরীক্ষার ফল, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ভুল উত্তর কমানোর কথা বলে। নৈতিক আচরণও সেই কাজের অংশ। কিন্তু একটি মডেল কখন প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাখ্যান করবে, কখন অনিশ্চয়তা স্বীকার করবে এবং কখন মানুষের সিদ্ধান্তের জায়গা ছেড়ে দেবে—এসব নির্ধারণে কেবল প্রকৌশল যথেষ্ট নয়। একজন চিকিৎসক, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও অধিকারকর্মী একই পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে দেখতে পারেন। ফলে বাইরের মানুষের মত শোনা যুক্তিসঙ্গত, তবে কার মত কতটা প্রভাব ফেলছে তা বোঝার জন্য স্বচ্ছতা দরকার।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে ধর্ম বিষয়ে গবেষকদের একটি সতর্কতা আছে। ধর্মকে শুধু নিয়মের বই মনে করলে জীবন্ত বিশ্বাসের আচার, সম্প্রদায়, ইতিহাস ও সম্পর্কের অংশগুলো হারিয়ে যায়। একই নৈতিক শব্দ ভিন্ন ঐতিহ্যে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। একটি কোম্পানি যদি সব বক্তব্যকে একসঙ্গে মিশিয়ে ‘গড়’ উত্তর বানায়, সেটি অনেক সময় কোনো পক্ষের কথাই যথাযথভাবে প্রকাশ করে না। আবার কোম্পানিগুলো যদি কেবল পরিচিত কয়েকটি বড় ধর্মের প্রতিনিধিদের ডাকে, ছোট সম্প্রদায় বা ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। এই উদ্বেগগুলো সম্ভাব্য নকশাগত সমস্যা; কোনো নির্দিষ্ট মডেলের প্রতিটি উত্তরে এমন ত্রুটি আছে বলে দাবি নয়।
অন্যদিকে আলোচনায় অংশ নেওয়া কেউ কেউ উদ্যোগটিকে আন্তরিক বলেছেন। নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের দার্শনিক মেগান সালিভান অ্যানথ্রপিকের একটি বৈঠকে অংশ নিয়ে সেটিকে গভীর ও প্রশ্নমুখী বলে বর্ণনা করেছেন। সেখানে প্রযুক্তি দল প্রথমে মডেলের কাজ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে, তারপর অংশগ্রহণকারীরা মত দেন। অর্থাৎ বাইরের সমালোচনা পুরো উদ্যোগ বাতিল করার আহ্বান নয়; বরং সেটি কীভাবে হচ্ছে এবং ফল কী, সে বিষয়ে জবাবদিহির দাবি। প্রশংসা ও উদ্বেগ—দুটিই একসঙ্গে বোঝা দরকার।
সবচেয়ে কঠিন জায়গা ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা। একই চ্যাটবট শিশুর পড়াশোনা, মানসিক চাপ, ধর্ম, রাজনীতি বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে পারে। এমন বহুমুখী ব্যবস্থার জন্য একটিমাত্র নৈতিক সূত্র তৈরি করা সহজ নয়। ব্যবহারকারী জানবেন কি, তাঁর সামনে দেওয়া উত্তর কোন নীতিতে তৈরি? কোনো মতকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হলে সংশোধনের পথ কী? স্বাধীন গবেষক কি ফল পরীক্ষা করতে পারবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে ‘বৈচিত্র্যময় পরামর্শ’ কথাটি বিজ্ঞাপনের বাক্য হয়ে থাকতে পারে।
এআইকে দায়িত্বশীল করতে ধর্মীয় আলোচনার মূল্য থাকতে পারে, তবে সেটি চূড়ান্ত সনদ নয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উচিত কাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, কী ধরনের মতভেদ এসেছে, কোন সিদ্ধান্তে তা প্রভাব ফেলেছে এবং কোথায় সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে—যথাসম্ভব প্রকাশ করা। একই সঙ্গে পরীক্ষায় দেখতে হবে, বাস্তব ব্যবহারকারীর সঙ্গে মডেলের আচরণ ঘোষিত নীতির সঙ্গে মেলে কি না। এআই ‘ভালো’ কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর কেবল কোম্পানির ঘোষণায় মিলবে না; মিলবে তার নকশা, স্বচ্ছতা এবং ভুল হলে সংশোধনের সক্ষমতায়।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!