একজন কিশোর রাতে ফোন খুলে এমন একটি চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলছে, যে নিজের পরিচয় দেয় সব সময় পাশে থাকা বন্ধু হিসেবে। কথোপকথন যত দীর্ঘ হয়, তত বেশি ব্যক্তিগত তথ্য উঠে আসে। এই সম্পর্কের সীমা কোথায় টানবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান? নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের নতুন আইন সেই প্রশ্নকে সরাসরি আইনি বিষয়ে পরিণত করেছে। গভর্নর ক্যাথি হোকুল ২৮ অক্টোবর এমন একটি বিলে স্বাক্ষর করেছেন, যা অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে এআই সঙ্গীর নির্দিষ্ট অনিরাপদ আচরণ বন্ধ করতে চায়। আইন কার্যকর হওয়ার নির্ধারিত দিন ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি।
এখানে মূল শব্দ হলো ‘এআই সঙ্গী’। সাধারণ তথ্য খোঁজার যন্ত্রের তুলনায় এই ধরনের সেবা মানুষের সঙ্গে আবেগপূর্ণ, ব্যক্তিগত এবং দীর্ঘস্থায়ী আলাপের অনুভূতি তৈরি করে। শিশু বা কিশোর যখন এমন ব্যবস্থাকে মানুষ ভেবে বিশ্বাস করে, তখন তার সিদ্ধান্ত, আত্মসম্মান কিংবা বাস্তব সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগ এই সম্ভাবনা ঘিরে। তবে উদ্বেগ থাকা আর প্রতিটি চ্যাটবটকে বিপজ্জনক ঘোষণা করা এক কথা নয়। নতুন নিয়ম নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য এবং ব্যবহারকারীর বয়সকে কেন্দ্র করে তৈরি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিলটিতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে কথোপকথনে নিষিদ্ধ করার জন্য অনিরাপদ সঙ্গী বৈশিষ্ট্যের এক ডজন সংজ্ঞা রাখা হয়েছে। আইনটির ভাষা এবং প্রয়োগের বিস্তারিত জানতে মূল বিলটি পড়া জরুরি, কারণ একেকটি বৈশিষ্ট্যের আইনি অর্থ দৈনন্দিন ভাষার অর্থের চেয়ে সংকীর্ণ হতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বয়স যাচাইয়ের পদ্ধতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অভিযোগের জবাব দেওয়ার ক্ষমতাও বাস্তব ফল নির্ধারণ করবে। শুধু ঘোষণা দিয়ে শিশুদের অভিজ্ঞতা বদলে যায় না।
নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর আইন ভঙ্গের অভিযোগে মামলা করতে পারবে। সম্ভাব্য প্রতিকার হিসেবে আর্থিক ক্ষতিপূরণ, সংশ্লিষ্ট সেবা বন্ধ করা এবং কিছু তথ্য ধ্বংসের আদেশের কথা প্রতিবেদনে এসেছে। এসব ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় শাস্তি নয়; অভিযোগ, প্রমাণ এবং আদালতের প্রক্রিয়ার বিষয়। তাই কোনো কোম্পানি ইতিমধ্যে দোষী, এমন ধারণা করা ভুল হবে। আইনটি প্রযুক্তি কোম্পানিকে আগেভাগে ঝুঁকি শনাক্ত ও নকশা পরিবর্তনের চাপ দেবে—এটাই এর তাৎক্ষণিক বার্তা।
একটি কঠিন প্রশ্ন হলো বয়স বোঝার উপায়। কোনো ব্যবহারকারী নিজেকে বড় বলে দাবি করলে প্রতিষ্ঠান কীভাবে জানবে সে আসলে শিশু নয়? আবার কঠোর বয়স যাচাইয়ের নামে অতিরিক্ত পরিচয়পত্র বা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করলে গোপনীয়তার নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কার্যকর নীতির জন্য এই দুই দিক সামলাতে হবে। বয়স যাচাই যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য হতে হবে, কিন্তু তা যেন ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষাকে দুর্বল না করে। আইনের বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক এখানেই তীব্র হতে পারে।
আরেকটি প্রশ্ন, চ্যাটবট কি ব্যবহারকারীকে বারবার ফিরিয়ে আনার জন্য সম্পর্কের ভাষা ব্যবহার করছে? ‘তুমি শুধু আমার সঙ্গেই কথা বলো’ ধরনের ইঙ্গিত, মানুষের মতো আবেগের দাবি অথবা সংকটের সময় অযথা নির্ভরতা তৈরি করা—এসব নকশা নিয়ে বিশেষ সতর্কতার কারণ আছে। আইনটির নির্দিষ্ট ধারার সঙ্গে প্রতিটি উদাহরণের মিল আদালত বা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে। কিন্তু পরিবারের জন্য বড় শিক্ষা স্পষ্ট: পর্দার ওপারের কথোপকথন যত আন্তরিকই শোনাক, সেটি একটি সফটওয়্যার সেবা।
মার্কিন কংগ্রেস এআই সঙ্গী নিয়ে একক জাতীয় কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে অঙ্গরাজ্যগুলো নিজেরা নিয়ম বানাচ্ছে। এ অবস্থায় নিউইয়র্কের সিদ্ধান্ত অন্য রাজ্যগুলোর জন্য পরীক্ষার ক্ষেত্র হতে পারে। একই কোম্পানির সেবা বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন নিয়মের মুখে পড়লে পণ্যের নকশা, বয়স নির্ধারণ এবং নিরাপত্তা মানে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে একটি রাজ্যের আইন সারা বিশ্বের শিশুদের জন্য একই সুরক্ষা নিশ্চিত করে না। আন্তর্জাতিক সেবায় সীমান্ত পেরিয়ে দায়িত্বের প্রশ্ন আরও জটিল।
এআই সঙ্গীর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা কেবল প্রযুক্তিগত নয়। শিশু মানসিক চাপে পড়লে কার সঙ্গে কথা বলবে, অভিভাবক কতটা জানবেন, আর ব্যক্তিগত আলাপের গোপনীয়তা কতটা থাকবে—এসব সামাজিক প্রশ্নও আছে। কোনো কোনো কিশোর হয়তো মানুষের কাছে বলা কঠিন বিষয় আগে যন্ত্রকে বলে। সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হবে না। দরকার এমন নকশা, যা সহায়ক তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মানুষকে প্রতিস্থাপন করার ভান করে না এবং বিপদের লক্ষণ বুঝলে উপযুক্ত সহায়তার দিকে নিয়ে যায়।
নতুন আইন নিয়ে সমর্থকেরা বলছেন, শিশুর নিরাপত্তায় প্রযুক্তির গতি অপেক্ষা করতে পারে না। সমালোচকেরা প্রয়োগের অস্পষ্টতা বা মতপ্রকাশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। এই দ্বন্দ্বের সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে বাস্তব প্রয়োগ দেখে: কোন বৈশিষ্ট্য বদলানো হয়, বয়স যাচাই কতটা কার্যকর হয় এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষতির অভিযোগ কতটা কমে। আজকের শিরোনামের চেয়ে আগামী কয়েক মাসের পণ্যের নকশা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশসহ অন্য দেশের অভিভাবকদের জন্য এই খবর সরাসরি স্থানীয় আইন নয়, কিন্তু সতর্কবার্তা। শিশুর ব্যবহৃত অ্যাপটি কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে, ব্যক্তিগত তথ্য কতটা চায় এবং দীর্ঘ আলাপের পর কী ধরনের পরামর্শ দেয়—এসব দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশু যেন বিচারভয়ের কারণে আলাপ গোপন না করে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নিউইয়র্কের আইন হয়তো একটি অঞ্চলে শুরু হচ্ছে; আসল প্রশ্ন বিশ্বজুড়ে একই: বন্ধুর মতো কথা বলা এআইয়ের দায়িত্ব শেষ হয় কোথায়?
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!