উৎসবের রঙে সাজছে...
টেকনোলজি

নতুন এআইয়ের ক্ষমতা দেখাল গুগল, কিন্তু সবাই এখনই ব্যবহার করতে পারবে না কেন?

নতুন এআইয়ের ক্ষমতা দেখাল গুগল, কিন্তু সবাই এখনই ব্যবহার করতে পারবে না কেন?
লেখা বড়/ছোট করুন:

গুগল ২৮ অক্টোবর জেমিনি ৪ কার্বন নামের নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ঘোষণা করেছে। কোম্পানির দাবি, জটিল কোড লেখা, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা এবং সাইবার নিরাপত্তার কাজে এটি আগের মডেলের চেয়ে শক্তিশালী। এমন ঘোষণা শুনে অনেকের মনে হতে পারে, আজই ফোন বা কম্পিউটারে নতুন সংস্করণটি চালু করে দেখা যাবে। বাস্তবে গুগল প্রথমে সীমিতসংখ্যক নির্বাচিত সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞকে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে। প্রশ্ন তাই মডেল কত শক্তিশালী, তার পাশাপাশি এত সীমিতভাবে ছাড়ার কারণ কী।

গুগলের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, কার্বন সফটওয়্যারের দুর্বলতা খুঁজে বের করা, সেই দুর্বলতা সত্যিই কাজে লাগানো যায় কি না যাচাই করা এবং নিরাপদ সংশোধনী তৈরির মতো কাজের পরীক্ষায় ভালো ফল দেখিয়েছে। এসব কাজের প্রতিরক্ষামূলক মূল্য আছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কোডে ত্রুটি আগে খুঁজে পেলে আক্রমণকারী সুযোগ নেওয়ার আগেই সেটি মেরামত করা যায়। কিন্তু একই সক্ষমতা ভুল হাতে গেলে আক্রমণ সহজও হতে পারে। তাই সাইবার নিরাপত্তায় শক্তিশালী এআই প্রকাশের সিদ্ধান্ত সাধারণ লেখালেখির অ্যাপ প্রকাশের মতো সরল নয়।

কোম্পানি কয়েকটি পরীক্ষার স্কোর জানিয়েছে: দুর্বলতা খোঁজার এসইসি-বেঞ্চ প্রোতে ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ, এক্সপ্লয়েটজিমে ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং প্যাচ তৈরির সিডব্লিউই-বেঞ্চে ৭১ শতাংশ। এগুলো নির্দিষ্ট পরীক্ষার ফল; বাস্তব বিশ্বের সব নেটওয়ার্কে একই হার পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নয়। পরীক্ষার প্রশ্ন, মডেলকে দেওয়া সহায়তা এবং সফলতার সংজ্ঞা বদলালে ফলও বদলায়। কোনো কোম্পানির নিজের ঘোষণার পাশাপাশি স্বাধীন মূল্যায়ন দেখা তাই জরুরি।

গুগল জানিয়েছে, নতুন মডেলটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের স্বেচ্ছামূলক প্রকাশপূর্ব পরীক্ষার প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে। প্রথম ধাপে কয়েকজন বিশ্বস্ত সাইবার প্রতিরক্ষাকারীকে প্রবেশাধিকার দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হবে। পরে আরও অংশীদারকে যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে। সাধারণ ডেভেলপার, ব্যবসা ও ভোক্তার জন্য কবে উন্মুক্ত হবে, সে বিষয়ে কোম্পানি নির্দিষ্ট দিন দেয়নি। ‘ঘোষণা’ আর ‘সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য’—এই দুই অবস্থার পার্থক্য মনে রাখা দরকার।

দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার ক্ষমতাও আলোচনার কেন্দ্রে। গুগল বলছে, তাদের অভ্যন্তরীণ কাজে কার্বন কয়েক দিন ধরে জটিল প্রকৌশল সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে পারে, ভুল পথে গিয়ে আবার ফিরে আসে এবং বড় কোডভান্ডারে সূক্ষ্ম ত্রুটির কারণ খোঁজে। এমন ব্যবস্থাকে অনেক সময় এজেন্টধর্মী এআই বলা হয়। এটি কেবল প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে না; একাধিক ধাপ পরিকল্পনা ও সম্পাদনের চেষ্টা করে। এতে উৎপাদনশীলতার সুযোগ বাড়ে, কিন্তু পর্যবেক্ষণ, অনুমতি এবং ভুল কাজ থামানোর প্রয়োজনও বাড়ে।

যে মডেল একটি প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার নিরাপদ করতে পারে, সেটি অনিচ্ছাকৃতভাবে গোপন তথ্য পড়তে বা ভুল ফাইলে পরিবর্তন আনতে পারে কি না—এ প্রশ্ন বাস্তব। তাই ব্যবহারের সময় কোন তথ্যের অনুমতি আছে, কোন কাজ মানুষের অনুমোদন ছাড়া করা যাবে না এবং প্রতিটি পদক্ষেপের রেকর্ড কীভাবে রাখা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী এআইয়ের মূল্য শুধু বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায় নয়; নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষাতেও। গুগলের সীমিত প্রবেশাধিকার সেই বৃহত্তর উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়, যদিও এর কার্যকারিতা ভবিষ্যতের ফলেই বোঝা যাবে।

কোম্পানি বলেছে, কার্বন আগের জেমিনি ৪ আর্গনের তুলনায় উন্নত। আর্গন ঘোষণার প্রায় দুই সপ্তাহ পরই নতুন সংস্করণ আসায় প্রতিযোগিতার গতি স্পষ্ট। এআই কোম্পানিগুলো দ্রুত নতুন মডেল আনছে, বিশেষত কোডিং ও সাইবার নিরাপত্তার বাজারে। তবে দ্রুততার সঙ্গে যাচাইয়ের চাপও বেড়ে যায়। কেবল এক কোম্পানির র‍্যাঙ্কিং দিয়ে অন্য মডেলের তুলনায় চূড়ান্ত শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা ঠিক হবে না; একই পদ্ধতিতে স্বতন্ত্র ও পুনরাবৃত্ত পরীক্ষা দরকার।

দামের কথাও ঘোষণা হয়েছে: প্রাথমিকভাবে প্রতি দশ লাখ ইনপুট টোকেনের জন্য দুই মার্কিন ডলার এবং আউটপুট টোকেনের জন্য দশ ডলার নির্ধারণের কথা গুগল জানিয়েছে। কিন্তু সীমিত প্রবেশাধিকার চলাকালে সাধারণ ব্যবহারকারী এই দাম দেখে সঙ্গে সঙ্গে সেবা কিনতে পারবেন, এমন নয়। ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক ব্যবহারে দাম, ব্যবহারের সীমা এবং নিরাপত্তা শর্ত বদলাতে পারে। প্রযুক্তি ঘোষণায় এসব শর্ত প্রায়ই মূল ক্ষমতার চেয়ে কম আলোচিত হয়, অথচ ব্যবহারকারীর সিদ্ধান্তে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সফটওয়্যার কোম্পানি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের জন্য খবরটির সম্ভাব্য তাৎপর্য আছে। কোড পর্যালোচনা, দুর্বলতা শনাক্ত এবং সংশোধন দ্রুত হলে ছোট দলও উপকৃত হতে পারে। তবে কোনো এআইয়ের পরামর্শ সরাসরি উৎপাদন ব্যবস্থায় চালু করা বিপজ্জনক; মানুষের পরীক্ষা ও নিরাপত্তা মান প্রয়োজন। মডেলকে সংবেদনশীল কোড দেওয়া যাবে কি না, তথ্য কোথায় যাবে এবং ভুল সংশোধনের দায় কার—এ প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ব্যবহারিক সুবিধা মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থাকে।

কার্বনকে ঘিরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হয়তো এই দ্বৈততা: একই ক্ষমতা রক্ষাকবচও হতে পারে, ঝুঁকির উৎসও। গুগল বলছে, আগে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা করে তারপর প্রবেশাধিকার বাড়াবে। এই পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা দেখা যাবে স্বাধীন মূল্যায়ন, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা এবং কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনার জবাব থেকে। আপাতত নিশ্চিত খবর হলো, শক্তিশালী মডেল এসেছে; তার দায়িত্বশীল ব্যবহার এখনো পরীক্ষার পর্যায়ে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেয়ার করুন:

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!