কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উচ্ছ্বাসের অভাব নেই। কয়েক সেকেন্ডে লেখা তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, ছবি শনাক্ত কিংবা গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া—এসব কাজে প্রযুক্তিটি ইতিমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন সঙ্গী। কিন্তু এই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা গড়ে উঠছে কি? ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের বৈঠকের আলোচনায় শুক্রবার সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা বড় হলেও সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকাতে এখনই কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন।
জর্জিয়েভা বিষয়টি বোঝাতে দ্রুতগতির রেসিং গাড়ির উদাহরণ দিয়েছেন। গাড়ি যত দ্রুতই চলুক, নিয়ন্ত্রণ হারালে আশপাশের মানুষের ক্ষতি হতে পারে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, প্রযুক্তির উপকারিতা পাওয়ার ইচ্ছা নিরাপত্তার প্রয়োজনকে আড়াল করতে পারে না। আলোচনায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্কও ছিলেন। তিনি মনে করেন, উন্নত AI ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিদ্ধান্ত কেবল কোম্পানিগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। সরকার, গবেষক, প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ—সব কিছুকে আলোচনায় আনতে হবে।
প্রশ্নটি শুধু ভবিষ্যতের কোনো কাল্পনিক ঝুঁকি নিয়ে নয়। এখনই বহু মানুষ AI দিয়ে আবেদনপত্র লিখছেন, সংবাদ সংক্ষেপ করছেন, তথ্য খুঁজছেন, অনুবাদ করছেন বা কাজের পরিকল্পনা বানাচ্ছেন। এসব কাজে ভুল তথ্য আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হাজির হলে ব্যবহারকারী সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারেন। কোনো প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য ভুল জায়গায় চলে যাওয়ার আশঙ্কাও আছে। আবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মানুষের যাচাই বাদ পড়লে একটি ছোট ভুল অনেক মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কোন কাজে যন্ত্রকে সহকারী রাখা হবে আর কোথায় মানুষকে শেষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সেটিই তাই গুরুত্বপূর্ণ।
চাকরির ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা আছে। ব্যাংককের আলোচনায় জর্জিয়েভা বলেন, কিছু কাজ বদলাবে বা নতুনভাবে তৈরি হবে, আবার পুনরাবৃত্তিমূলক কিছু কাজ হারিয়ে যেতে পারে। মোট প্রভাব সম্পর্কে এখনই সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। কারণ একটি খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও অন্য খাতের কর্মীর দক্ষতা বদলাতে সময় ও অর্থ লাগে। নতুন কাজ তৈরি হওয়া আর পুরোনো কাজ হারানো একই মানুষের জীবনে একই সময়ে ঘটবে না। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতির লাভ দেখিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের বাস্তব সমস্যাকে ছোট করে দেখা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশের মতো দেশে প্রশ্নটি আরও কয়েক স্তরে আসে। সবাই কি সমান গতির ইন্টারনেট, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ এবং প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা পাচ্ছেন? শহরের বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছোট প্রতিষ্ঠান বা প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীর সুযোগ কি এক? জর্জিয়েভা নিজেও বলেছেন, AI-এর সুফল বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার জরুরি। প্রযুক্তি চালু করলেই তাই সমান সুযোগ তৈরি হয় না; ব্যবহারের অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণও দরকার।
সংবাদমাধ্যমে AI ব্যবহারের একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাক। কোনো প্রতিবেদনের নথি দ্রুত সংক্ষেপ করতে এটি সাহায্য করতে পারে। কিন্তু নথিতে কী বলা হয়েছে, কার বক্তব্য কোন প্রেক্ষাপটে দেওয়া এবং প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই হয়েছে কি না—এসব দায়িত্ব সাংবাদিক ও সম্পাদকের। একইভাবে হাসপাতালে কোনো সফটওয়্যার তথ্য সাজিয়ে দিতে পারে, কিন্তু রোগীর চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষিত মানুষের বিচার অপরিহার্য। কাজের ধরন আলাদা হলেও নিয়মটি এক: সুবিধা যত বাড়বে, ভুলের দায় ও সংশোধনের পথ তত পরিষ্কার করতে হবে।
এই আলোচনায় একটি বাস্তব প্রশ্ন থেকে যায়। কোনো AI ব্যবস্থা ভুল করলে ব্যবহারকারী কার কাছে অভিযোগ করবেন? প্রতিষ্ঠান কি জানাবে কোন তথ্যের ভিত্তিতে ফল তৈরি হয়েছে, কে তা পরীক্ষা করেছেন এবং কীভাবে সংশোধন হবে? নিরাপত্তা বলতে শুধু প্রযুক্তিগত বাধা বোঝালে উত্তর পাওয়া যাবে না। স্বচ্ছ নিয়ম, নিয়মিত পরীক্ষা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থাও প্রয়োজন। দ্রুতগতির দৌড়ে এগিয়ে যাওয়াই সাফল্য নয়; দৌড়ের পথ নিরাপদ রাখা এবং সবাইকে তার সুফল পাওয়ার সুযোগ দেওয়াই বড় পরীক্ষা।
প্রযুক্তি গ্রহণের আগে প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে তিনটি সহজ প্রশ্ন করতে পারে: কোন সমস্যার সমাধান হচ্ছে, ভুল হলে তা কে ধরবেন এবং ব্যবহারকারী কীভাবে আপত্তি জানাবেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লিখিতভাবে না থাকলে নতুন ব্যবস্থা চালু করেও আস্থা পাওয়া কঠিন। ব্যাংককের আলোচনা মনে করিয়ে দিয়েছে, দ্রুততা নিয়ে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি জবাবদিহির নিয়মও সমান দ্রুততায় তৈরি করতে হবে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!