যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা হলেই অনেকের চোখে ভাসে এমন অস্ত্র, যা নিজেই লক্ষ্য বেছে নেয়। বাস্তবে প্রশ্নটি আরও বড়। নজরদারির ছবি বাছাই, সম্ভাব্য হুমকির সংকেত বিশ্লেষণ, তথ্যের ভিড়ে অগ্রাধিকার ঠিক করা কিংবা কমান্ডারকে পরামর্শ দেওয়ার মতো কাজেও এআই ব্যবহৃত হতে পারে। এসব ধাপে মানুষের সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন থাকে, তা বোঝাই এখন কঠিন হয়ে উঠছে। এই উদ্বেগ সামনে রেখে জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউএনআইডিআইআর সামরিক ক্ষেত্রে এআই নিয়ে একটি নতুন আন্তর্জাতিক আলোচনার মঞ্চ চালু করতে যাচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মঞ্চটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। ২১ অক্টোবর পর্যন্ত এটি একটি নির্ধারিত অনুষ্ঠান, হয়ে যাওয়া বৈঠক নয়। ইউএনআইডিআইআরের নিজস্ব ঘোষণা বলছে, তাদের এআই, শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক সেন্টার অব এক্সিলেন্স জুনে শুরু হয়েছে; এবার সেই কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ফোরামে আগ্রহ প্রকাশের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। ফলে পুরো প্রতিষ্ঠানটি কাল প্রথম তৈরি হচ্ছে—এমন ধারণা ঠিক নয়। নতুন অংশটি হলো বিভিন্ন পক্ষকে ধারাবাহিক আলোচনায় যুক্ত করার কাঠামো।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক রবিন গাইসের উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, বিশেষ করে পারমাণবিক ক্ষেত্রসহ নিরাপত্তার সিদ্ধান্তে মানুষের বিবেচনার জায়গা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি আছে। তিনি এটাও স্বীকার করেছেন, মেশিন কখন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে সিদ্ধান্তের ওপর কার্যকর প্রভাব ফেলবে, তার স্পষ্ট মাপ এখনো নেই। অনিশ্চয়তাটিই গবেষণার বিষয়। এই সতর্কতাকে এমন প্রমাণ হিসেবে নেওয়া যাবে না যে কোনো নির্দিষ্ট অস্ত্র ইতিমধ্যে মানুষের অনুমতি ছাড়াই যুদ্ধ শুরু করেছে।
সমস্যা বোঝার জন্য একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি কল্পনা করা যায়। কোনো ব্যবস্থা হাজার হাজার উপগ্রহচিত্র থেকে কয়েকটি জায়গাকে জরুরি বলে চিহ্নিত করল। মানুষ শেষ বোতামটি চাপলেও তার সামনে তথ্য বাছাইয়ের কাজটি হয়ে গেছে আগেই। যদি ব্যবস্থাটি ভুল ছবি ধরে, পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য থেকে শেখে অথবা নিজের নিশ্চিত হওয়ার মাত্রা পরিষ্কার না করে, শেষ সিদ্ধান্তে মানুষের ভূমিকা কাগজে যত বড় দেখায় বাস্তবে তত বড় নাও থাকতে পারে। এটি ব্যাখ্যার উদাহরণ; চলমান কোনো অভিযানের বিবরণ নয়।
নিরাপত্তা খাতে গোপনীয়তা আর জবাবদিহির টানাপোড়েনও আছে। রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রযুক্তির ক্ষমতা প্রকাশ করতে চায় না। অথচ নিয়ম বানাতে হলে জানতে হয় কোন কাজে এআই লাগানো হচ্ছে, ভুল শনাক্ত করা কীভাবে সম্ভব এবং ক্ষতি হলে দায় কার। সফটওয়্যার নির্মাতা, সেনাবাহিনী, কূটনীতিক, আইনবিদ ও গবেষকেরা আলাদা ভাষায় একই প্রশ্ন করেন। একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম তাঁদের এক টেবিলে আনতে পারলে অন্তত শব্দগুলোর অর্থ এবং ঝুঁকি মাপার পদ্ধতি নিয়ে মিল তৈরি হতে পারে। সেটি নিজে কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়।
ইউএনআইডিআইআর বলছে, কেন্দ্রটির উদ্দেশ্য জ্ঞান একত্র করা, বিভিন্ন পক্ষকে যুক্ত রাখা এবং প্রমাণভিত্তিক নীতির জন্য সহায়তা দেওয়া। এক দিনের সম্মেলনের পর আলোচনা থেমে যাওয়ার বদলে নিয়মিত কাজ চালানোর লক্ষ্য এতে আছে। এপি জানিয়েছে, সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে এআইয়ের অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়েও প্রতিষ্ঠানটি আলাদা উদ্যোগ নিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী আর অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর সক্ষমতা এক নয়, কিন্তু কম খরচে প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়লে ঝুঁকির পরিসর বদলাতে পারে। তাই আলোচনায় শুধু সর্বাধুনিক অস্ত্র রাখলেই পুরো ছবি পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশসহ দূরের দেশগুলোর পাঠকের কাছেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। আন্তর্জাতিক নিয়ম ও প্রযুক্তিগত মান অনেক সময় বড় শক্তিগুলোর আলোচনায় তৈরি হয়, পরে তার প্রভাব অন্য দেশের নিরাপত্তা নীতি, সফটওয়্যার কেনা এবং তথ্য সুরক্ষায় পৌঁছায়। ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের উদ্বেগ সেখানে কতটা শোনা হচ্ছে, তা দেখার প্রয়োজন আছে। একই সঙ্গে প্রতিটি এআই ব্যবহারের সঙ্গে প্রাণঘাতী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রকে এক করে দেখলে বাস্তব সমস্যা বোঝা কঠিন হবে। ব্যবহারের ধাপ, মানুষের তদারকি এবং ভুলের ফল আলাদা করে পরীক্ষা করতে হবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন নতুন ফোরাম কত দেশকে নিয়ে শুরু হচ্ছে তা নয়; আলোচনা থেকে যাচাইযোগ্য নিয়ম, পরীক্ষা এবং জবাবদিহির পথ বেরোয় কি না। ২২ অক্টোবরের অনুষ্ঠান একটি সূচনা হতে পারে। মানুষের হাতে সিদ্ধান্ত আছে বলা সহজ, কিন্তু তথ্য বাছাই থেকে আঘাতের অনুমোদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সেই নিয়ন্ত্রণ সত্যিই আছে কি না, তার উত্তর এখনো খোলা। সেই উত্তর খোঁজাই এআই নিয়ে জাতিসংঘের নতুন উদ্যোগের আসল পরীক্ষা।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!