একটি কম্পিউটার মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার ছবি, সংকেত ও অবস্থান বিশ্লেষণ করে লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু তার পরের ধাপে যদি মানুষের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তখন শেষ অনুমোদন কার হাতে থাকবে? সামরিক কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার নিয়ে এই প্রশ্নই সামনে এনেছে জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউএনআইডিআইআর। চলতি অক্টোবর মাসে প্রতিষ্ঠানটির নতুন ফোরাম চালুর ঘোষণা প্রযুক্তির গতির সঙ্গে নীতি তৈরির ব্যবধান আবার দৃশ্যমান করেছে। আলোচনার কেন্দ্রে আছে মানুষের নিয়ন্ত্রণ, ভুল তথ্যের ঝুঁকি এবং যুদ্ধের মতো উচ্চ ঝুঁকির পরিস্থিতিতে জবাবদিহি।
২২ অক্টোবর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইউএনআইডিআইআরের এআই, শান্তি ও নিরাপত্তাবিষয়ক সেন্টার অব এক্সেলেন্সের ফোরাম উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী, ফোরামটি সরকার, গবেষক, শিল্প খাত ও নাগরিক সমাজকে নিয়মিত আলোচনায় যুক্ত করার জায়গা হিসেবে তৈরি। চলতি বছরের জুনে কেন্দ্রটি চালু হয়। অর্থাৎ নতুন আয়োজন কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সামরিক এআই নিষিদ্ধ করার ঘোষণা নয়; প্রথম ধাপে এটি মত বিনিময়, পরামর্শ সংগ্রহ ও নীতিগত সহযোগিতার কাঠামো। এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি, কারণ একটি বৈঠক থেকেই বিশ্বের সব সামরিক ব্যবস্থার নিয়ম বদলে যাবে না।
জাতিসংঘের সংবাদ সম্মেলনে ইউএনআইডিআইআরের পরিচালক রবিন গাইস সতর্ক করেছেন, সামরিক সিদ্ধান্তে মানুষের বিবেচনার সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। তাঁর বক্তব্যের পটভূমি শুধু স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নয়। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, নজরদারি, আগাম সতর্কতা, লক্ষ্য চিহ্নিত করা এবং সাইবার কার্যক্রমের মতো নানা ধাপে এআই ঢুকছে। একটি ধাপ আলাদা করে নিরীহ মনে হলেও কয়েকটি ধাপ একসঙ্গে যুক্ত হলে সিদ্ধান্তের গতি এমন হতে পারে যে মানুষ কেবল পর্দায় ফল দেখে অনুমোদন দিচ্ছে। অনুমোদনটি তখন কতটা অর্থবহ, সেটিই নীতিনির্ধারকদের সামনে আসল পরীক্ষা।
সমস্যার একটি অংশ হলো ভুলের উৎস সহজে বোঝা যায় না। সেন্সরের তথ্য অসম্পূর্ণ হতে পারে, ছবির প্রেক্ষাপট বদলাতে পারে, আর প্রশিক্ষণের তথ্য বাস্তব পরিস্থিতিকে পুরোপুরি প্রতিনিধিত্ব নাও করতে পারে। এসবই প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন; কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্যবস্থায় এমন ভুল ঘটেছে বলে এই ফোরাম দাবি করছে না। তবু যুদ্ধক্ষেত্রে ভুল অনুমানের মূল্য অন্য অনেক ক্ষেত্রে ভুলের চেয়ে ভয়াবহ। তাই প্রযুক্তি কত দ্রুত কাজ করে, তার পাশাপাশি ভুল শনাক্ত হলে কে থামাবে এবং পরে তদন্তে কোন সিদ্ধান্তের রেকর্ড পাওয়া যাবে, সেটিও জরুরি।
আরেকটি কঠিন প্রশ্ন ভাষা নিয়ে। বিভিন্ন দেশ ‘নিরাপত্তা’, ‘স্বয়ংক্রিয়তা’ কিংবা ‘মানব নিয়ন্ত্রণ’ বলতে ভিন্ন জিনিস বুঝতে পারে। জাতিসংঘের আলোচনায় এআই নিরাপত্তা বিষয়ে একটি অভিন্ন শব্দভাণ্ডার তৈরির কথাও এসেছে। শব্দের অর্থ পরিষ্কার না থাকলে আন্তর্জাতিক বৈঠকে একই বাক্যে সম্মতি দিয়েও দেশগুলো ভিন্ন নীতি অনুসরণ করতে পারে। একই সঙ্গে সশস্ত্র অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর হাতে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেটিও গবেষণার বিষয়। প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার যেন অযথা বাধাগ্রস্ত না হয়, সে ভারসাম্য রাখার প্রয়োজনীয়তাও ইউএনআইডিআইআর উল্লেখ করেছে।
সাধারণ পাঠকের কাছে এই বিতর্ক দূরের যুদ্ধনীতি মনে হতে পারে। কিন্তু যে প্রযুক্তি আজ ছবি শনাক্ত করে বা তথ্য সাজায়, সেটিই সিদ্ধান্ত সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঢুকছে। সামরিক ক্ষেত্রে তার ব্যবহার মানব নিয়ন্ত্রণের সীমা কোথায় হবে, সে প্রশ্নটিকে সবচেয়ে তীব্র করে তোলে। নতুন ফোরাম সফল কি না, তা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তব্যে বোঝা যাবে না। দেখতে হবে, দেশগুলো কি নিয়মিত তথ্য ভাগ করে, সিদ্ধান্তের দায় নির্দিষ্ট করে এবং মানুষের কার্যকর হস্তক্ষেপের বাস্তব মানদণ্ডে একমত হতে পারে। আপাতত সবচেয়ে বড় খবরটি হলো, প্রযুক্তিকে ঘিরে আলোচনার টেবিল তৈরি হয়েছে; সেই টেবিল থেকে বাধ্যতামূলক নিয়ম কবে আসবে, তার উত্তর এখনো খোলা।
বিশেষজ্ঞদের জন্য পরবর্তী কাজ তাই শুধু দ্রুততর সফটওয়্যার বানানো নয়। পরীক্ষা কীভাবে হবে, বিপদের সংকেত কে যাচাই করবে, সিদ্ধান্ত স্থগিত করার ক্ষমতা কার থাকবে এবং ক্ষতি হলে কাকে জবাব দিতে হবে—এসব প্রশ্নে প্রকাশ্য ও নির্দিষ্ট উত্তর খুঁজতে হবে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!