রোগী হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেলে সমস্যা সব সময় উৎপাদনের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। ওষুধ কত আছে তার হিসাব ভুল হতে পারে, মজুত অন্য জায়গায় পড়ে থাকতে পারে, কিংবা দেরিতে কেনাকাটার কারণে চাহিদার সময় সরবরাহ পৌঁছাতে পারে না। বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় এই ব্যবস্থাগত সমস্যাগুলো খুঁজতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ দল ১৬টি প্রতিষ্ঠানে মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন করেছে। ২৫ অক্টোবর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ জানানো হয়েছে। প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি: ডিজিটাল মজুততালিকা থাকলেও রোগীর হাতে ওষুধ পৌঁছানোর নিশ্চয়তা কীভাবে বাড়বে?
মূল্যায়নটি ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলে। ছয়টি জেলা—খুলনা, সুনামগঞ্জ, রাজশাহী, খাগড়াছড়ি, ভোলা ও নীলফামারীর জেলা হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দলগুলো যায়। তারা ইলেকট্রনিক লজিস্টিকস ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম, সংক্ষেপে ইএলএমআইএস, কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে তা দেখে। একই সঙ্গে কাগজের হিসাবের সঙ্গে বাস্তব মজুত মিলেছে কি না, ওষুধ কোথায় ও কীভাবে রাখা হচ্ছে এবং ফার্মেসির কাজের পদ্ধতি পরীক্ষা করা হয়। এটি পুরো দেশের প্রতিটি হাসপাতালের জরিপ নয়; নির্বাচিত ১৬টি প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন। ফলে কোনো একটি সমস্যা সব জায়গায় একই মাত্রায় আছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২১ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে এই ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করেছে। বর্তমানে নয়টি পরীক্ষামূলক জেলার ৮৪টি প্রতিষ্ঠানে, কেন্দ্রীয় সরবরাহ কার্যক্রমে এবং কিছু নির্দিষ্ট রোগ কর্মসূচিতে এর ব্যবহার রয়েছে। পরিকল্পনা হলো কোথায় কত ওষুধ আছে তা সময়মতো দেখা, চাহিদা আগে থেকে অনুমান করা এবং ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই সংকেত পাওয়া। কিন্তু সফটওয়্যারে তথ্য লেখা হলেই হিসাব নির্ভরযোগ্য হয় না। মানুষকে নিয়মিত তথ্য দিতে হবে, বাস্তব তাকের সঙ্গে সংখ্যা মিলাতে হবে এবং ভুল ধরা পড়লে সংশোধন করতে হবে।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে কয়েকটি বাধা ধরা পড়েছে। কিছু জায়গায় যথেষ্ট যন্ত্রপাতি বা প্রশিক্ষিত কর্মী নেই। একই তথ্য কাগজে এবং ডিজিটাল ব্যবস্থায় আলাদা করে দিতে হয়, ফলে কাজ বাড়ে। কোথাও নথিতে দেখানো ওষুধের পরিমাণ আর তাকের বাস্তব মজুতের মধ্যে অমিল পাওয়া গেছে। মজুত রাখার পরিবেশ ও নজরদারিতেও সীমাবদ্ধতা আছে। এগুলোর পাশাপাশি কেনাকাটার বিলম্ব, বাজেট ও সরবরাহের বাধা ঘাটতি বাড়াতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে। একটি অমিলের মানে কী—চুরি, ভুল লেখা, দেরিতে হালনাগাদ, নাকি অন্য কারণ—তা বিস্তারিত তদন্ত ছাড়া বলা যাবে না।
ওষুধের নিরাপদ সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, মেয়াদ এবং আলাদা ধরনের ওষুধের ব্যবস্থাপনা ঠিক না হলে মজুত কাগজে থাকলেও সব ওষুধ ব্যবহারযোগ্য নাও হতে পারে। তাই ‘কত বাক্স আছে’ প্রশ্নের পাশাপাশি ‘কতটি ভালো অবস্থায় আছে’ প্রশ্নটিও জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভালো ফার্মেসি চর্চা শক্তিশালী করার কথা বলেছে, যাতে ওষুধের মান রক্ষা, অপচয় কমানো এবং প্রাপ্যতা বাড়ানো যায়। এই মূল্যায়ন নির্দিষ্ট কোনো ওষুধের মান নষ্ট হয়েছে বলে ঘোষণা নয়; এটি ব্যবস্থার ঝুঁকি শনাক্ত করার প্রচেষ্টা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফোয়ারা তাসমিম বলেছেন, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি। তাঁর বক্তব্যে আগাম চাহিদা বুঝে সরবরাহ করার গুরুত্ব এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যনীতি উপদেষ্টা সাঙ্গে ওয়াংমোও মনে করিয়ে দিয়েছেন, ডিজিটাল ব্যবস্থা সফল করতে সঠিক তথ্য, প্রশিক্ষিত কর্মী, কেনাকাটা এবং সংরক্ষণ—সব একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এই বক্তব্যগুলো পরিকল্পনার দিক নির্দেশ করে; মূল্যায়নের ফলে রোগীরা ইতিমধ্যে বেশি ওষুধ পাচ্ছেন, এমন প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন এখন তৈরি হচ্ছে। প্রাথমিক সুপারিশে কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও তদারকি, সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন, ওষুধের তালিকা একরকম করা, কেনাকাটার বাধা কমানো এবং কাগজ-ডিজিটাল দ্বৈত কাজের বোঝা হ্রাসের কথা আছে। দেশের সব জায়গায় ব্যবস্থা বাড়ানোর আগে কোন ঘাটতি কত খরচে ঠিক করা যাবে, তা জানা দরকার। রোগীর জন্য শেষ হিসাবটি খুব সহজ: প্রেসক্রিপশনে লেখা প্রয়োজনীয় ওষুধটি ঠিক সময়ে, ভালো মানে এবং সাশ্রয়ী উপায়ে পাওয়া যাচ্ছে কি না। প্রযুক্তির সাফল্য শেষ পর্যন্ত সেই অভিজ্ঞতাতেই মাপা হবে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!