একটি বড় ব্যাংক যখন একই ঘোষণায় চাকরি কমানোর পরিকল্পনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলে, তখন প্রশ্নটি দ্রুত ছড়ায়: মানুষের জায়গা কি সফটওয়্যার নিচ্ছে? যুক্তরাজ্যভিত্তিক বার্কলেস জানিয়েছে, ২০২৬ সালে প্রায় পাঁচ হাজার পদ কমানোর পরিকল্পনা আছে। এটি প্রতিষ্ঠানের মোট কর্মীর প্রায় পাঁচ শতাংশ। ব্যাংক প্রযুক্তি বদল, সাংগঠনিক সরলীকরণ এবং এআইয়ের সাহায্যে দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলেছে। কিন্তু সব পাঁচ হাজার চাকরি সরাসরি একটি এআই ব্যবস্থার কারণে হারাচ্ছে—এমন হিসাব প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ করেনি। তাই খবরের আকর্ষণ যেমন বড়, কারণ ব্যাখ্যাতেও সতর্কতা দরকার।
রয়টার্সের ২২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বার্কলেসের অর্থবিষয়ক প্রধান আনা ক্রসের বক্তব্য এসেছে। তাঁর হিসাবে, পদ কমার উল্লেখযোগ্য অংশ সহায়ক বিভাগে পড়বে; এর মধ্যে প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার-সংক্রান্ত কাজও রয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে ব্যাংকটির ঘোষণাকে আরও বড় একটি প্রবণতার মধ্যে রাখা হয়েছে: বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অবকাঠামো ও বিশেষজ্ঞ কর্মীর জন্য অর্থ সরাচ্ছে, একই সময়ে কিছু পুরোনো পদ বাদ দিচ্ছে। তবে একই প্রতিষ্ঠানে নতুন ধরনের কাজও তৈরি হতে পারে। কত চাকরি বাদ যাচ্ছে আর কত নতুন কাজ হচ্ছে, দুটো সংখ্যাই না দেখলে পরিবর্তনের পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় না।
ব্যাংকে ‘কাজ’ বলতে শুধু গ্রাহকের সামনে টাকা জমা বা ঋণ দেওয়া বোঝায় না। নথি পরীক্ষা, নিয়ম মানার নজরদারি, সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রাহক প্রশ্নের উত্তর, তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রতিবেদন তৈরির মতো অসংখ্য কাজ আছে। কিছু কাজ বারবার একই ধাপে চলে; সেগুলোতে স্বয়ংক্রিয়তার সুযোগ বেশি। আবার ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য যেখানে বড়, সেখানে মানুষের যাচাই, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি। এআই কোনো তথ্য সাজাতে দ্রুত হতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রকের কাছে ভুলের জবাব কে দেবেন, সে প্রশ্ন প্রযুক্তি একা মেটায় না।
বার্কলেসের ঘোষণার আরেকটি দিক সময়। পরিকল্পিত পাঁচ হাজার পদের সবকটি একই দিনে শূন্য হয়নি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের শুরু থেকে কিছু কাটছাঁট হয়েছে এবং বাকি অংশ বছরের শেষে বাস্তবায়নের লক্ষ্য। তাই ‘আজ পাঁচ হাজার কর্মী বরখাস্ত’ ধরনের শিরোনাম বিভ্রান্তিকর হবে। কর্মীদের জন্য অবশ্য পরিকল্পনার ঘোষণাও বাস্তব উদ্বেগ তৈরি করে। কোন দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে, পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ থাকবে কি না, বদলি পদে যাওয়ার রাস্তা আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল মোট সংখ্যা দিয়ে মেলে না।
এআইয়ের ভূমিকা মাপাও সহজ নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান খরচ কমাতে চাইলে প্রযুক্তি তার একটি উপায় হতে পারে; একই সঙ্গে লাভের লক্ষ্য, বাজারের চাপ, আগে নেওয়া পুনর্গঠন পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত কাজ করে। একটি চাকরি কমেছে মানেই সেই কাজ পুরোপুরি এআই করেছে, এমন নয়। কাজটি অন্য কর্মীদের মধ্যে ভাগ হতে পারে, বাইরের সেবাদাতার কাছে যেতে পারে অথবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সত্যিকারের প্রভাব বুঝতে হলে উৎপাদনশীলতা, গ্রাহকসেবা, ভুলের হার এবং নতুন পদের তথ্য সময়ের সঙ্গে দেখতে হবে।
ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্যও পরিবর্তনটি গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত সেবা ভালো, কিন্তু জটিল অভিযোগ বা ভুল লেনদেনের ক্ষেত্রে একজন মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব কি না, সেটি সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তে পক্ষপাত বা ভুল হলে তা শনাক্ত এবং সংশোধনের ব্যবস্থা থাকা দরকার। অর্থনৈতিক সেবায় মানুষের সঞ্চয়, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জড়িত। তাই খরচ কমানোর ঘোষণাকে শুধু শেয়ারবাজারের খবর হিসেবে পড়লে গ্রাহক ও কর্মীর বাস্তব অভিজ্ঞতা আড়ালে থাকে।
বার্কলেসের ঘটনা একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়: এআই ব্যবহারের লাভ কারা পাবেন এবং বদলের খরচ কারা বহন করবেন? প্রতিষ্ঠান নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে; কর্মীরাও নতুন দক্ষতা শিখতে পারেন। কিন্তু সেই রূপান্তরের সময়, সুযোগ এবং সুরক্ষা সমানভাবে বিতরণ না হলে ‘দক্ষতা’ শব্দটি অনেকের কাছে চাকরি হারানোর অন্য নাম হয়ে ওঠে। আগামী মাসগুলোতে ঘোষিত সংখ্যা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, কোন কাজ বদলায় এবং গ্রাহকসেবা কীভাবে চলে—সেখানেই খবরটির আসল উত্তর মিলবে।
এই রূপান্তর সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্যেরও মূল্য আছে। ব্যাংক যদি কোন কাজ প্রযুক্তি দিয়ে বদলাচ্ছে, কত কর্মীকে অন্য পদে নিচ্ছে এবং সেবার মান কীভাবে যাচাই করছে, তা জানায়, কর্মী ও গ্রাহক দুপক্ষই সিদ্ধান্ত বুঝতে পারবেন। অস্পষ্ট ‘এআই দক্ষতা’ শব্দের আড়ালে প্রকৃত প্রভাব লুকিয়ে রাখা হলে বিশ্বাস কমবে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!