মেনোপজের কথা উঠলে অনেকেই মধ্যবয়সের কথা ভাবেন। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় চিকিৎসক ও গবেষক প্রিয়া সাতালকার-গ্যোৎস বলেছেন, তাঁর প্রথম তীব্র গরম লাগার উপসর্গ দেখা দেয় মাত্র ২৬ বছর বয়সে। পরে মাসিক অনিয়মিত হয়, রাতের ঘুম ভাঙে এবং নানা শারীরিক পরিবর্তন আসে। কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেও তিনি দ্রুত পরিষ্কার উত্তর পাননি। ৩৩ বছর বয়সে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর অবস্থার যথাযথ ব্যাখ্যা মেলে। তাঁর গল্পটি একজন মানুষের অভিজ্ঞতা; সব নারীর ক্ষেত্রে একই লক্ষণ বা একই পথ থাকবে—এমন নয়। তবে অল্প বয়সে মেনোপজের সম্ভাবনা কেন অনেক সময় আলোচনার বাইরে থাকে, সেই প্রশ্নটি এতে স্পষ্ট হয়।
ডব্লিউএইচওর ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে প্রিয়া বলেছেন, শুরুতে তাঁর উপসর্গকে চাপ, জীবনযাপনের পরিবর্তন বা ওজন কমার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছিল। বয়স কম বলে মেনোপজের সম্ভাবনা নিজেকেও অবিশ্বাস্য লেগেছিল। এ জায়গায় চিকিৎসার একটি সাধারণ সমস্যা দেখা যায়: কোনো লক্ষণ পরিচিত বয়সের বাইরে ঘটলে রোগী ও চিকিৎসক উভয়েই ভিন্ন কারণ আগে ভাবতে পারেন। কিন্তু মাসিকের পরিবর্তন, ঘুমের সমস্যা বা গরম লাগা একাধিক কারণে হতে পারে। তাই একটি খবর পড়ে নিজে রোগ নির্ণয় করা ঠিক নয়; চিকিৎসকের কাছে উপসর্গের ইতিহাস পরিষ্কারভাবে তুলে ধরাই বেশি সহায়ক।
প্রিয়া কয়েক বছর ধরে নিজের লক্ষণ ও মাসিকচক্রের তথ্য রেখেছিলেন। পরে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা করে অবস্থার মূল্যায়ন করেন। তাঁর বক্তব্যে শুধু রোগের নাম জানার বিষয়টি নয়, রোগী হিসেবে সেই তথ্য গ্রহণ করার মানসিক চাপও উঠে এসেছে। চিকিৎসক নিজে হয়েও তিনি জানান, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সন্তান ধারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুনে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। ভালো চিকিৎসা কেবল পরীক্ষার ফল জানানোর মধ্যে শেষ হয় না; রোগীর প্রশ্ন শোনা, সিদ্ধান্ত বোঝানো এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তার জায়গা রাখাও তার অংশ।
ডব্লিউএইচওর সাক্ষাৎকারে ঘুমের ব্যাঘাত, ত্বক ও চোখের শুষ্কতা, মনোযোগ ও মেজাজের পরিবর্তনের মতো অভিজ্ঞতার কথা আছে। কিন্তু এসবের কোনো একটি দেখলেই মেনোপজ হয়েছে বলা যায় না। একই উপসর্গ অন্য কারণেও হতে পারে, এবং ব্যক্তি ভেদে তীব্রতাও ভিন্ন। বিশেষ করে অল্প বয়সে উদ্বেগ থাকলে সঠিক পথ হলো যোগ্য স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলা। কখন পরীক্ষা প্রয়োজন, অন্য কারণ বাদ দিতে হবে কি না এবং কী ধরনের চিকিৎসা উপযুক্ত—এসব ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। অন্য কারও অভিজ্ঞতা থেকে সরাসরি ওষুধ বা হরমোন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিরাপদ নয়।
প্রিয়ার অভিজ্ঞতার বড় দিকটি গবেষণার ঘাটতি। তিনি বলেন, অল্প বয়সে মেনোপজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্পষ্ট প্রমাণ খুঁজতে গিয়ে সীমাবদ্ধতা দেখেছেন; বহু গবেষণা সাধারণত পরে বয়সে মেনোপজ হওয়া নারীদের নিয়ে। ফলে অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের জন্য কোন চিকিৎসা কতটা কার্যকর, দীর্ঘ সময়ে কী ফল হয় এবং কোন গোষ্ঠীর কী প্রয়োজন—এসব জানতে আরও ভালো গবেষণা দরকার। তিনি বৈশ্বিক নির্দেশনার কথাও বলেছেন, যাতে প্রমাণের মান যাচাই করে চিকিৎসকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি তৈরি হয়। তবে নির্দেশনা থাকলেও প্রত্যেক রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য এটি শুধু একটি বিদেশি চিকিৎসকের গল্প নয়। নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার জায়গা না থাকলে অস্বস্তিকর উপসর্গ অনেক সময় চেপে রাখা হয়। পরিবারে কেউ বিষয়টি তুললে তুচ্ছ করা বা ‘এ বয়সে এমন হয় না’ বলা সাহায্য পাওয়ার পথ কঠিন করতে পারে। আবার সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া একটি তালিকা দেখে নিজের অবস্থা নিশ্চিত ধরে নেওয়াও বিপজ্জনক। ভালো প্রথম ধাপ হতে পারে উপসর্গ কখন শুরু হয়েছে, কতবার হচ্ছে এবং দৈনন্দিন কাজে কী প্রভাব পড়ছে, তা লিখে চিকিৎসককে জানানো।
প্রিয়া বলেছেন, সহানুভূতিশীল চিকিৎসা, পরিবারের পাশে থাকা এবং একই অভিজ্ঞতার মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ তাঁকে সাহায্য করেছে। এই সমর্থন চিকিৎসার বিকল্প নয়, কিন্তু একা বোধ কমাতে পারে। তাঁর গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো এই: বয়সের কারণে কারও অভিজ্ঞতাকে আগেই অস্বীকার করা উচিত নয়। প্রশ্ন শুনতে হবে, প্রমাণ খুঁজতে হবে এবং অনিশ্চয়তা থাকলে সেটিও সৎভাবে বলতে হবে। আগাম মেনোপজ নিয়ে আরও গবেষণা ও স্পষ্ট নির্দেশনা তৈরি হলে ভবিষ্যতে অন্যদের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!