আগের শীতে ফ্লুর টিকা নেওয়া থাকলে এ বছর আর দরকার হবে না—এমন ধারণা অনেকের। কিন্তু ২৩ অক্টোবরের নতুন বার্তায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় দপ্তর ঠিক বিপরীত বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়েছে। ইনফ্লুয়েঞ্জার ভাইরাস সময়ের সঙ্গে বদলায়, আর আগের টিকা থেকে পাওয়া সুরক্ষাও ধীরে ধীরে কমে। তাই বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের প্রতি মৌসুমের আগে নতুন করে টিকার বিষয়ে স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলতে বলা হচ্ছে। এই পরামর্শ বিশেষভাবে ইউরোপীয় অঞ্চলের আসন্ন শীতকাল ঘিরে দেওয়া হয়েছে; অন্য দেশে টিকার সময় ও যোগ্যতা স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ফ্লুর কারণে প্রায় ৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ মানুষ গুরুতর শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতায় ভোগেন। বছরে আনুমানিক ২ লাখ ৯০ হাজার থেকে ৬ লাখ ৫০ হাজার মৃত্যুর হিসাবও সংস্থা দিয়েছে। এগুলো বৈশ্বিক বার্ষিক অনুমান, চলতি মৌসুমের রোগীর সংখ্যা নয়। সংখ্যাগুলো দেখায় কেন সাধারণ মনে হওয়া জ্বরও স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় চাপ তৈরি করতে পারে। একই সময়ে শ্বাসতন্ত্রের অন্য ভাইরাসও ছড়াতে পারে, ফলে শুধু উপসর্গ দেখে কোন ভাইরাস দায়ী তা নিশ্চিত হওয়া সব সময় সম্ভব নয়।
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় দপ্তর প্রবীণ ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত মানুষ, রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তি এবং খুব বেশি স্থূলতার মধ্যে থাকা মানুষদের গুরুতর ফ্লুর বেশি ঝুঁকির দলে রেখেছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্যও বার্ষিক টিকার সুপারিশ করেছে, যাতে তাঁরা নিজেরা সুরক্ষিত থাকেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের কাছে সংক্রমণ পৌঁছানোর সম্ভাবনা কমে। কারও ব্যক্তিগত অবস্থায় টিকা কখন ও কোন ধরনের হবে, তা অবশ্যই চিকিৎসক বা স্থানীয় টিকাদান কেন্দ্রের নির্দেশনা দেখে ঠিক করতে হবে।
প্রশ্ন আসতে পারে, একই রোগের জন্য বারবার টিকা কেন? ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ধরন বদলায় বলে টিকার উপাদান নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। নতুন মৌসুমে আগের টিকার সুরক্ষা একই মাত্রায় থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এমনকি ঘুরে বেড়ানো ভাইরাস আগের বছরের মতো হলেও সময়ের সঙ্গে প্রতিরোধক্ষমতা কমতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ কারণেই বার্ষিক টিকাকে গুরুতর অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায় বলছে। তবে কোনো টিকাই প্রত্যেক সংক্রমণ শতভাগ ঠেকাবে—এমন দাবি সংস্থাটি করেনি।
টিকার পাশাপাশি সহজ কয়েকটি অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। অসুস্থ বোধ করলে ঘরে থাকা, ফ্লুর মতো উপসর্গ হলে মাস্ক পরা, কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখা, নিয়মিত হাত পরিষ্কার করা এবং ঘরের বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করার কথা বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এগুলোর উদ্দেশ্য শুধু নিজেকে রক্ষা করা নয়; পরিবারের প্রবীণ সদস্য, ছোট শিশু বা আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তির কাছে সংক্রমণ পৌঁছানোর সম্ভাবনা কমানো। কাজ বা পড়াশোনার চাপের কারণে অসুস্থ অবস্থায় বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক সময় অন্যদের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।
ইউরোপে ফ্লুর মৌসুম সাধারণত নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি শুরু হয় এবং জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে বেশি ছড়ায় বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। তবে এ বছরের প্রকৃত শুরু, তীব্রতা এবং কোন ধরন বেশি থাকবে তা আগেভাগে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বাংলাদেশ বা চীনের মতো অন্য অঞ্চলের পাঠকদের জন্য ইউরোপের এই সময়সূচি সরাসরি প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও পরামর্শই বেশি প্রাসঙ্গিক।
সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বার্তাটি তাই সরল: গত বছরের টিকা নেওয়া থাকলেও নিজের বর্তমান ঝুঁকি আর এই বছরের স্থানীয় নির্দেশনা দেখে সিদ্ধান্ত নিন। বেশি ঝুঁকিতে থাকলে দেরি না করে বিশ্বস্ত স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বলুন। শীতের রোগ ছড়ানোর আগে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ আছে; মৌসুম শুরু হলে সেই সুযোগ ছোট হয়ে যায়।
মন্তব্য (0)
আপনার মন্তব্য লিখুন
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন!